ত্রিফলার অন্যতম ফল আমলকি গাছ পরিচিতি

ত্রিফলার অন্যতম ফল আমলকি গাছ পরিচিতি
আমলকি গাছ

প্রকৃতিতে এমন অনেক ফল বা গাছ রয়েছে যেগুলো চিকিৎসাশাস্ত্রে খুব বেশি পরিমাণে ব্যবহার্য এবং জনপ্রিয়। তাদের মধ্যে আমলকি খুবই জনপ্রিয়। আজ আমাদের প্রতিবেদন অতি পরিচিত আমলকি গাছ সম্পর্কে।

ত্রিফলা কি?

আমলকি গাছ সম্পর্কে জানার আগে জেনে নিই ত্রিফলা সম্পর্কে। ত্রিফলা কি?

ত্রিফলা হচ্ছে তিনটি ফলের সমাহার। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় আমলকি, হরিতকি এবং বহেরা এই তিনটি ফল এবং এদের গাছ খুবই প্রয়োজনীয় উপাদান। এই ৩টি ফলকেই একত্রে ত্রিফলা বলা হয়।

ত্রিফলার প্রতিটি ফলের গুণাগুণ অবর্ণনীয় এবং এটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ত্রিফলার সর্বাধিক পরিচিত স্বাস্থ্যগুণ হচ্ছে এগুলো হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।

আমাদের অতি পরিচিত ত্রিফলার আমলকি একটি অনত্যম ফল। দরকারি ফল হিসেবে এটি অতি জনপ্রিয় একটি ফল।

শুধু তাই নয়, আমলকি গাছ সৌন্দর্য্যে দিক থেকেও অনন্য।

নামকরণ:

ইংরেজিতে আমলকিকে amla বা Indian gooseberry বলা হয়। সংস্কৃত ভাষায় এর নাম আমলক। অঞ্চলভেদে এটি আমলা নামেও সুপরিচিত।

বৈজ্ঞানিক নাম:

আমলকি গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Emblica officinalis Gaertn.

পরিবার:

আমলকি গাছ ফাইলান্থাসি পরিবারের ফাইলান্থুস গণের একপ্রকার ভেষজ উদ্ভিদ।

প্রাপ্তিস্থান:

আমলকি গাছ ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় দেখা যায়।

বাংলাদেশেরও প্রায় সব অঞ্চলে আমলকি গাছ দেখা যায়।

আকার-আকৃতি:

আমলকি মাঝারি আকৃতির গাছ। এর উচ্চতা ৮-১৮ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

পাতার আকার ১-২ ইঞ্চি হয়ে থাকে।

আমলকি ফল গোলাকার, যার ব্যাস ১/২ ইঞ্চির কম বা বেশি হয়।

গঠন ও বৈশিষ্ট্য:

আমলকি গাছের আকৃতি মাঝারি ধরণের। এর শাখা প্রশাখা কম। বাকল নরম, মসৃণ এবং ম্লান ধূসর বর্ণের হয়ে থাকে। আবার অনেক সময় অণুজ্জল লাল বা বাদামী লাল বর্ণের হয়ে থাকে।

গাছটির পাতাগুলো ছোট ছোট, ঘনবদ্ধ ও দেখতে অতি সুদর্শন।

শীতকালে আমলকি গাছ সব পাতা ঝড়িয়ে উদম হয়ে পড়ে।

আমলকির মৌসুম:

শরৎকাল থেকে শীতকাল পর্যন্ত আমলকির প্রধান মৌসুম। তখন বাজারেও প্রচুর আমলকি বিক্রি হতে দেখা যায়।

বসন্তের আগমনীতে আমলকি গাছের শূণ্য শাখা আবারো কচি পাতার কোমল সবুজে ভরে উঠে।

ফুল:

বসন্তে আমলকি গাছে ক্ষুদ্র আকৃতির অসংখ্য ফুল ফোঁটে। ফুলগুলো এতই ছোট যে খালি চোখে ঠিকমতো দেখাও যায় না। ফুলের রঙ হলুদ।

স্ত্রী ও পুরুষ উভয় আমলকি গাছে ফুল ধরে।

ফল:

মূলত ফলই হচ্ছে এই গাছের সেরা বৈশিষ্ট্য। ফলের রঙ হালকা সবুজ বা হলদে সবুজাভ।

আমলকি ফল
অসামান্য গুণে সমৃদ্ধ আমলকি

আমলকি ফল গোলাকার। মৃদু শিরাযুক্ত, কোমল শাঁসযুক্ত এবং প্রায় স্বচ্ছ ধরণের।

ফলের স্বাদ টক। তাই চিনি কিংবা লবণসহ কাঁচা বা শুকনো অবস্থায় খাওয়া যায়।

গাছের বয়স ৪/৫ বছর হলেই আমলকি গাছ ফল দেওয়া শুরু করে।

বীজ:

ফলের ভেতরের একমাত্র কঠিন আঁটিটিই হচ্ছে বীজ। এই আঁটি আসলে ৬টি শিরার সমষ্টি।

এই বীজের মাধ্যমে আমলকি গাছের বংশবিস্তার করা হয়।

পুষ্টিগুণ:

আমলকি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ভিটামিন ‘সি’র সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে। এজন্য আমলকিকে ভিটামিন ‘সি’র রাজা বলা হয়।

প্রতি ১০০ গ্রাম আমলকি গাছে রয়েছে জলীয় অংশ- ৯১.৪, মোট খনিজ রয়েছে- ০.৭, আঁশ- ৩.৪, খাদ্যশক্তি- ১৯, আমিষ রয়েছে- ০.৯, চর্বি- ০.১, শর্করা- ৩.৫, ক্যালসিয়াম- ৩৪মি, লৌহ- ১.২, ভিটামিন বি-১- ০.০২, ভিটামিন- ০.০৮মি, এবং ভিটামিন সি- ৪৬৩।

তাছাড়া আমলকিতে রয়েছে আরও অনেক ভেষজ গুণ।

আরো পড়ুন:
কালোজিরা গাছ – মহৌষধী গুণ সমৃদ্ধ এক উদ্ভিদ 
অ্যালোভেরা বা ঘৃতকুমারী সর্বাধিক পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ 
ভেষজ গুণে সমৃদ্ধ থানকুনি পাতা

উপকারিতা:

আমলকির গুণাগুণ বলে শেষ করা মতো নয়। এই উদ্ভিদের কান্ড, ফল, পাতা, ছাল সবকিছুই উপকারী।

  • আমলকী নিয়ে বিভন্ন প্রকার প্রাথমিক গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আমলকি ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে।

  • এছাড়াও প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে, রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস ও অস্টিওপোরোসিস রোগে আমলকির রস অল্প হলেও কাজ করে।

  • কয়েক প্রকারের ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও আমলকির কার্যকারিতা প্রমাণ পাওয়া গেছে।

  • আমলকীর ফল, পাতা এবং ছাল থেকে তৈরিকৃত ওষুধে পরীক্ষামূলক ভাবে কিছু রোগ নিরাময়েরও প্রমাণ পাওয়া গেছে যেমন-ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, প্রদাহ এবং কিডনিসংক্রান্ত রোগ।

  • আমলকি মানুষের রক্তের কোলেস্টেরল-মাত্রা হ্রাস করতে পারে বলেও প্রমাণ পাওয় গেছে।

  • পশু-পাখিদের মধ্যে হরিণের প্রিয় খাবার আমলকি। কোথাও কোথাও সুপাড়ির বিকল্প হিসেবেও শুকনো আমলকি ব্যবহার করতে দেখা যায়।

  • পেটের পীড়া, কাশিতে আমলকি বিশেষ উপকারী।

  • আমলকি গাছের পাতার রস আমাশয় প্রতিরোধে টনিক হিসেবে ব্যবহার্য।

  • গাছের বাকল, ফল ও পাতা ক্যানিংয়ে কাজে লাগে।

  • মাথার ত্বক ও চুলের জন্য আমলকি খুবই উপকারী। তাই কাঁচা কিংবা শুকনো যেকোন অবস্থাতেই এটির ব্যপক ব্যবহার রয়েছে।

  • শুকনো ফল শ্যাম্পু কলপ ও কালির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

subscribe to our youtube channel 2

শেয়ার করুন -

১ মন্তব্য

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন