নিশাচর প্রাণী হিসেবে পরিচিত পেঁচা পাখি

নিশাচর প্রাণী হিসেবে পরিচিত পেঁচা পাখি
নিশাচর প্রাণী হিসেবে পরিচিত পেঁচা পাখি

রাত জাগলে তাকে বলা হয় নিশাচর। পেঁচা পাখি এমনই এক পাখি যে রাত জাগে। একারণে পেঁচাকে নিশাচর পাখি বলা হয়।

এদের কিছু ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে দৃষ্টিশক্তি। রাতের অন্ধকারেও তারা খুব ভাল দেখতে পায়। বরং দিনের আলোই কিছু কিছু পেঁচার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আজ আমরা জানব এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের অধিকারি প্রাণী পেঁচা পাখি সম্পর্কে কিছু তথ্য।

নামকরণ:

পেঁচা, প্যাচা বা পেচক পাখিটিকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। পেঁচা পাখি ইংরেজি owl.

বৈজ্ঞানিক নাম:

পেঁচার বৈজ্ঞানিক নাম Strigiformes.

পরিবার:

পেঁচা পাখি স্ট্রিজিডি পরিবারের অন্তর্গত কর্ডাটা পর্বের প্রাণী।

এরা পক্ষী শ্রেনীর নিশাচর প্রাণী। ।

এখন পর্যন্ত পেঁচার প্রায় ২০০ টি প্রজাতি টিকে রয়েছে।

প্রজাতি:

পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন প্রজাতির পেঁচা পাখি পাওয়া যায়। যেমন- Barn owl, Snowy owl, Great Horned owl, Long-eared owl, Barred owl, Little owl, Burrowing owl, Great grey owl, tawny owl, Ural owl, Striped owl, Crested owl, BrownFish owl, Golden mask owl, Maned owl, Northern saw-whet owl, Eurasian owl, Boreal owl, Eastern screech owl, Northern hawk-owl  ইত্যাদি।

তবে এখনও পর্যন্ত প্যাঁচার যতগুলো প্রজাতির দেখা পাওয়া গেছে তাদের সকলকে একত্রে দুটো গোত্রে ভাগ করা হয়েছে।

যেমন- সাধারণ প্যাঁচা বা স্ট্রিগিডি এবং লক্ষ্মীপ্যাঁচা বা টাইটোনিডি।

বালাদেশে প্রায় ২৭ প্রজাতির পেঁচার দেখা মেলে।

এদের মধ্যে আবার কিছু রয়েছে স্থায়ী আর কিছু পরিযায়ী- ২৫টি স্থায়ী এবং ২ টি পরিযায়ী।

বিভিন্ন প্রজাতির প্যাঁচার ডাক বিভিন্ন রকম হয়। ডাকের বিভিন্নতা অনুসারে বাংলায় বিভিন্ন প্যাঁচার ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ হয়েছে।

যেমন: হুতুম পেঁচা (Bubo bengalensis), ভুতুম পেঁচা (Ketupa zeylonensis),  লক্ষ্মীপেঁচা (Tyto alba), খুঁড়ুলে পেঁচা (Athene brama), কুপোখ (Ninox scutulata), নিমপোখ (Otus lepiji) ইত্যাদি।

প্রাপ্তিস্থান:

পৃথিবীর সব স্থানেই কম-বেশি পেঁচা পাখি দেখা যায়।

তবে কুমেরু, গ্রীনল্যান্ড এবং কিছু নিঃসঙ্গ দ্বীপে এরা অত্যন্ত বিরল।

আকার-আকৃতি:

প্রজাতিভেদে পেঁচার আকার-আকৃতিতে অনেক পার্থক্য রয়েছে।

গঠন:

পেঁচার মাথা দেহের তুলনায় ছোট। এদের মুখমন্ডল চ্যাপ্টাকৃতির। পুচ্ছ গোলাকার, ডানা চওড়া এবং চোখ মাথার সম্মুখভাগে অবস্থিত।

সাধারণত পেঁচার চোখের চারদিকে পালক দ্বারা সুন্দররূপে গোছানো থাকে। এগুলো বৃ্ত্তাকারে সাজানো থাকে।

বই এর ভাষায় পেঁচার এই সুন্দর কাঠামোকে ফেসিয়াল ডিস্ক বলে।

এই ফেসিয়াল ডিস্ক অসমভাবে সাজানো থাকে এবং শিকারের করা শব্দকে শ্রবণে সহায়তা করে। যারফলে পেঁচা শিকারের অবস্থান সম্পর্কে সঠিক নির্ণয় করতে পারে।

পেঁচার অক্ষিগোলক সামনের দিকে অগ্রসর অবস্থায় থাকে। একারণে এরা দ্বিনেত্রদৃষ্টির অধিকারি।

আরো পড়ুন:
বিশ্বের সবচাইতে উচু প্রাণী জিরাফ
ইরাবতী ডলফিন – প্রাণী জগৎ
প্রজাপতি – প্রাণী জগৎ

তবে পেঁচার দৃষ্টিশক্তি দূরবদ্ধ। একারণে পেঁচা পাখি তার চোখের সামনের কয়েক ইঞ্চি দুরত্বে অবস্থিত কোন বস্তু পরিষ্কার ভাবে দেখতে পায় না।

বৈশিষ্ট্য:

পেঁচা পাখি খুবই অদ্ভুদ প্রকৃতির প্রাণী। অন্যান্য পাখির তুলনায় এর বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

পেঁচা তার মাথাকে এক দিকে ১৩৫ ডিগ্রী পর্যন্ত কোণ ঘোরাতে পারে। তাই দুইদিক একত্রে এদের দৃষ্টিকোণ ২৭০ ডিগ্রী।

একারণে পেঁচা পাখি পেছনের দিকেও খুব সহজেই দেখতে পায়।

পেঁচা উপর থেকে ছোঁ মেরে শিকার করে থাকে।

শিকার করা এবং শিকারকে ধরে রাখতে এরা বাঁকানো ঠোট, নখর এবং চঞ্চু ব্যবহার করে থাকে।

এদের চঞ্চু এবং নখরে বিশেষ একধরণের পালক অবস্থিত। যারে কারণে পেঁচারা তাদের ধরা শিকারকে সেই পালকের মাধ্যমে অনুভব করতে পারে।

এ পাখির সবচেয়ে অবাক করা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো এদের চোখ রাতের স্বল্প আলোয়ও অধিক আলোর সংস্থান করতে  পারে। একারণে এই শিকারি পাখিরা অন্ধকারেও বেশ ভালভাবেই দেখে।

এদের চোখ এতটাই আলো শোষণ করে যে দিনের বেলার উজ্জ্বল আলো এদের অস্বস্তির কারণ হয়।

তবে কিছু কিছু দিবাচর পেঁচাও পৃথিবীতে রয়েছে।

পেঁচার শ্রবণশক্তিও প্রচন্ড প্রখর। শব্দের মাধ্যমে এরা চলাচল করতে পারে।

এমনকি শুধুমাত্র শব্দের দ্বারা চলাচলের সময় এরা নিরেট অন্ধকারেও শিকার করতে পারে।

সামান্য মাথা ঘুরাতেই পেঁচা পাখি ইদুরের শষ্যদানা খাবার শব্দের মতন অনুচ্চ শব্দও শুনতে পায়।

এর কারণ পেঁচার মাথার গড়ন রুপান্তরিত হওয়ার জন্য এদের ২ কানে কিঞ্চিত আগে-পরে শব্দ পৌছায়।

খাদ্যাভাস:

পেঁচা একটি শিকারি পাখি। এরা রাত জেগে শিকার করে। আর তাই পেঁচাকে নিশাচর পাখি বলা হয়।

অধিকাংশ পেঁচা পাখি বিভিন্ন প্রকার স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন- ইদুর, কিংবা ছোট কীট-পতঙ্গ শিকার করে খায়।

আবার কিছু কিছু প্রজাতির পেঁচা পাখি মাছও শিকার করে।

বাসস্থান:

পেঁচা পাখি প্রধানত নিঃসঙ্গচর। অর্থ্যাৎ এরা একা থাকতে পছন্দ করে।

curious24world - বাসা তৈরি করতে পারে না তাই পেঁচা গাছের কোটরে, পাহাড়, পাথরের গর্তে বাস করে
curious24world – বাসা তৈরি করতে পারে না তাই পেঁচা গাছের কোটরে, পাহাড়, পাথরের গর্তে বাস করে

এরা গাছের কোটর, পাহাড় অথবা পাথরের গর্ত এবং পুরানো দালানকোঠায় বাস করে।

পেঁচা পাখি সম্পর্কে আরও কিছু অদ্ভুদ বৈশিষ্ট্য:

অদ্ভুদ এই প্রাণীটির রয়েছে অদ্ভুদ অনেক বৈশিষ্ট্য। যা সাধারণ মানুষ সহ গবেষকদেরও  আকৃষ্ট করে তুলেছে।

চলুন পেঁচা পাখি সম্পর্কে কিছু অদ্ভুদ তথ্য জেনে নিই

  • কিছু প্রজাতির পেঁচারা পানিতে সাতার কাটতে পারে। শিকার ধরতে কিছু পেঁচাকে জলাশয়ের কাছাকাছি যেতে হয়।  কিন্তু তখন পালক ভিজে গেলে পেঁচার পক্ষে উড়া কঠিন হয়ে পরে। আর এ অবস্থায় পেঁচারা ডানা সাহায্যে সাতড়ে তীরে পৌছায়।

  • পেঁচার ঘাড়ের বৈশিষ্ট্য বিষ্ময়কর। এদের ঘাড়ে ১৪টি অস্থিসন্ধি থাকে। যেখানে মানুষের ঘাড়ে রয়েছে এর অর্ধেক।

  • এরা সহজে চোখ নারাতে পারে না।

  • কিউবার জিয়ান্ট আউল হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আকৃতির পেঁচা। যার উচ্চতা প্রায় সাড়ে ৩ ফুট। তবে এটি অনকে আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। গবেষকরা কিউবার বনাঞ্চলে এদের দেহাবশেষ আবিষ্কার করেন।

  • মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে পেঁচা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব অঞ্চলের পেঁচাদের প্রধান শিকার ইদুর। আর এইসব ইদুর হচ্ছে ফসলের শত্রু। ইসরাইল, জর্দানের মত বিভিন্ন দেশে কৃষিজমি আশেপাশে পেঁচার জন্য বাসা বানিয়ে রাখা হয়। যাতে তারা কৃষি জমির ইদুর শিকার করে ফসলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে।

  • কিছু কিছু পেঁচার এমন পালক রয়েছে যা অবিকল চোখের মত দেখা যায়। শিকারি প্রাণীকে বিভ্রান্ত করে এই নকল চোখ।

  • তুষার দেশে বসবাসকারী তুষার পেঁচারা শীতের মৌসুমে দক্ষিণ দিকে ৩০০০ মাইল পর্যন্ত ভ্রমণ করে।

  • পেঁচারা দুই কানে দুই রকম শব্দতরঙ্গ শনাক্ত করতে পারে।

  • নারী পেঁচারা আকৃতিতে পুরুষ পেঁচাদের তুলনায় বড় হয়ে থাকে।

  • পেঁচা পাখি সাধারণত বাসা তৈরি করতে পারে না। তাই এরা গাছের কোটর, পাথর বা পাহাড়ের গর্তে বাস করে।

প্রচলিত ধারণা:

পেঁচা পাখি খুবই অদ্ভুদ সুন্দর পাখি হলেও নিশাচর পাখি পেঁচা সম্পর্কে সমাজে বিভিন্ন রকম ধারণা ও সংস্কার প্রচলিত আছে।

অনেকেই এই পাখিকে অশুভ প্রতীক বলে মনে করে থাকে।

কোন কোন সমাজে পেঁচার ডাক শুনতে পেলে বাড়ির সিঁড়িতে পানি ঢেলে দেওয়া হয়। এবং মনে করা হয় এতে পেঁচার অশুভ প্রভাব থেকে বাড়ি সুরক্ষিত থাকে।

আবার কিছু কিছু সম্প্রদায়ের কাছে এ পাখিটি পরম পূজনীয়। যেমন- সনাতন ধর্মীয় মতানুসারে লক্ষীদেবীর বাহন পেঁচা।

তবে বিজ্ঞানীরা পেঁচাকে শুভ কিংবা অশুভ কোনটিই মানতে নারাজ। তাদের কাছে পেঁচা পাখি অন্যান্য জীবের মত প্রাণীজগতের এক অংশ।

curious

শেয়ার করুন -

2 মন্তব্য

  1. ব্লগটি পড়ে অনেক ভাল লাগল। পাখিটির সম্পর্কে নতুন অনেক কিছু জানতে পারলাম। পাখিদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন