বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এর ইতিহাস – কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালির জাতীয় চেতনা

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এর ইতিহাস - কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালির জাতীয় চেতনা
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এর ইতিহাস - কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালির জাতীয় চেতনা

ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। 

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি এ ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত আকার ধারণ করলেও মূলত এর বীজ বপন হয়েছিল বহুদিন আগেই।

পাকিস্তান জন্মের প্রায় সাত মাস পর, ১৯৪৮ সালের মার্চে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ যখন তার জীবনের প্রথম ও শেষবারের মত পূর্ববঙ্গে এসেছিলেন – তখনো তিনি হয়তো ভাবেন নি যে ভাষা আন্দোলন এর মাধ্যমে সেখানে তার উচ্চারিত কিছু কথা একসময় তারই প্রতিষ্ঠিত নুতন দেশটির ভাঙন ডেকে আনতে ব্যাপক ভুমিকা রাখবে।

মি. জিন্নাহ সে সময় পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লীগেরও সভাপতি ছিলেন।

৯ দিনের পূর্ববঙ্গ সফরকালে তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি সভায় বক্তৃতা দেন।

ঢাকায় করা তার প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে – যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান নামে পরিচিত।

সেখানে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে উর্দু – এছাড়া আর অন্য কোন ভাষা নয়।

ইংরেজিতে দেয়া সেই বক্তৃতায় তিনি সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলেছিলেন, “আমি খুব স্পষ্ট করেই আপনাদের বলছি যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, এছাড়া অন্য কোন ভাষা নয়। কেউ যদি এনিয়ে আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে সে আসলে পাকিস্তানের শত্রু।”

এর কয়েকদিন পর মি. জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রদের সামনে আরো একটি ভাষণ দিলেন।

সেখানেও তিনি একই কথা ব্যাক্ত করে বলেন, পাকিস্তানের প্রদেশগুলো নিজেদের সুবিধার্থে সরকারি কাজে যে কোন ভাষা ব্যবহার করতে পারে – তবে রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে একটিই এবং তা হচ্ছে উর্দু।

মি. জিন্নাহর এই বক্তৃতাগুলোর কথা পরে বিভিন্ন বইয়ে, পত্রিকায় বহু ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন।

তারা লিখেছেন, কার্জন হলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলার পর প্রচুর ছাত্র তখন ‘না’ ‘না’ বলে চিৎকার করে এর প্রতিবাদ করেছিলেন – যা মি. আলী জিন্নাহকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে তুলেছিল।

কয়েক মুহূর্ত নিরব থেকে আবার বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করেছিলেন তিনি।

সবকিছুতেই উর্দু আর ইংরেজি, কোথাও বাংলা নেই-

মি. আলী জিন্নাহ পূ্বেবঙ্গে ঢাকায় এসে এসব কথা বলেছিলেন এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে।

তার ঢাকা সফরে আসার আগেই পূর্ববঙ্গে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে পর পর অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লক্ষ্য করা যায়, নতুন গঠিত দেশটির ডাকটিকিট, মুদ্রা, মানি-অর্ডার অথবা টাকা পাঠানোর ফর্ম, ট্রেনের টিকেট, পোস্টকার্ড – যেকোন কিছুতেই শুধুমাত্র উর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে।

এর প্রতিবাদে ঢাকায় প্রচুর ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা বিক্ষোভ সমাবেশও করেছিলেন।

পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত উর্দুভাষী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রতি বিরূপ আচরণের অভিযোগও ওঠে আসে। আবার একই রকম মনোভাবের শিকার হন পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তারাও।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং সরকারি চাকরি গুলিতেও অবাঙালিদের প্রাধান্যতা বেশি ছিল।

পরবর্তীতে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তান থেকেই নৌবাহিনীতে লোক নিয়োগের ভর্তি পরীক্ষাও সংগঠিত হচ্ছে উর্দু ও ইংরেজি ভাষাতে।

এ নিয়ে তৎকালীন সময়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত পত্রিকা ইত্তেহাদে।

মি. আলী জিন্নাহ যেদিন কার্জন হলে ভাষণ দেন – সেদিনই বিকেলে তার সাথে সাক্ষাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একটি দল । এ সময় রাষ্ট্র ভাষা নিয়ে তাদের মধ্যকার তীব্র বিতর্ক প্রায় ঝগড়াঝাটির স্তরে পৌঁছে যায়।

মি. আলী জিন্নাহকে একটি স্মারকলিপিও দেয় ছাত্র দলটি।

সেই স্মারকলিপিতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয় এবং কানাডা, বেলজিয়াম ও সুইৎজারল্যান্ডের মত একাধিক রাষ্ট্রভাষা আছে এমন কিছু দেশের উদাহরণ দেয়া হয়।

এই ছাত্র নেতাদের ভেতর অনেকেই ছিলেন মি. জিন্নাহর দল মুসলিম লীগের।

কিন্তু ভাষার প্রশ্নে এসে পূর্ব বঙ্গের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশ কেন্দ্রীয় নেতাদের চাইতে ভিন্ন ভূমিকা পালন করেছিল।

বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি

সদ্য জন্মানো নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হবে – এ নিয়ে বিতর্ক আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল ভারত-ভাগের অনেক আগেই।

অবাঙালি মুসলিম রাজনীতিবিদ ও অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবীরা জানিয়েছিলেন উর্দূ ভাষার কথা – অপরদিকে ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ ও এনামুল হকের মত বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন।

ভাষা আন্দোলন এর ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বই রচনা করেছেন বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও লেখক বদরুদ্দীন উমর।

‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ নামক এ বইটিতে বদরুদ্দীন উমর বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, সেসময় কীভাবে ছোট বড় প্রচুর রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন ছাত্র-নাগরিক সংগঠন, আর শিক্ষক-অধ্যাপক-চিন্তাবিদরা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে একযোগে কথা বলতে শুরু করেছিলেন।

সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র ও অধ্যাপক একত্রিত হয়ে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই তমদ্দুন মজলিস নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলেন, যারা শুরু থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে নানারকম সভাসমিতি-আলোচনার আয়োজন করে যাচ্ছিল।

এছাড়াও গঠন করা হয়েছিল একটি ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদও।’

এর নেতারা ১৯৪৮ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের সাথে এক বৈঠক করে ডাকটিকিট-মুদ্রা ইত্যাদিতে বাংলা না থাকা বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

ফজলুর রহমান তাদের আশ্বাস প্রদানের সাথে বলেন যে এ ঘটনাগুলো ঘটেছে ‘নিতান্ত ভুলবশত।

১৯৪৭-এর ৫ই ডিসেম্বর ঢাকার বর্ধমান হাউসে (বর্তমান বাংলা একাডেমি ভবন) বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সংগঠিত বৈঠকে প্রস্তাব নেয়া হয় যে উর্দুকে পূর্ব বাংলার সরকারি বা রাষ্ট্রীয় ভাষা করা হবে না।

এ বৈঠক চলাকালীন বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলা একাডেমি ভবনের সামনে বিক্ষোভও করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা।

যারফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৬-৭ মাস পরই মি. আলী জিন্নাহ যখন ঢাকা সফরে আসেন – তখন রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রীতিমত উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন।

রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গ এতটা গুরুত্বপূর্ণ হবার কারণ-

উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাবার্তা আরম্ভ হবার সাথে সাথেই পূর্ব বঙ্গের ছাত্র, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, বুদ্ধিজীবী আর রাজনীতিবিদরা বুঝে গিয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে এটা বাঙালিদের জন্য চরম বিপর্যয় বয়ে আনবে।

তারা বুঝেছিলেন, এর মাধ্যমে পাকিস্তানে উর্দুভাষীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, বাঙালিরা সরকারী ও সামরিক বাহিনীতে চাকরি-বাকরির সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে উর্দু-জানা জনগোষ্ঠীর তুলনায় পিছিয়ে পড়বেন।

এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে বাঙালি মুসলমানরা যে উন্নয়ন ও সামাজিক বিকাশের স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছিল – তা চরমভাবে ব্যাহত হবে।

অথচ সম্পূর্ণ পাকিস্তানের বাস্তবতা ছিল এই যে সেদেশের পশ্চিমাংশের তুলানায় পূর্বাংশে – এমনকি গোটা দেশ মিলিয়েও – সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই ছিল বাংলা।

পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত ৪০ শতাংশের কিছু বেশি জনগণের ভাষা ছিল পাঞ্জাবী, আর মাত্র ৪ শতাংশের মুখের ভাষা ছিল উর্দু।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে না – এটা পূর্ববঙ্গের ছাত্র ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম দিয়িছিল।

“একদিকে ভাষা ও আত্মপরিচয়ের আবেগ তো রয়েছেই -এছাড়াও এর একটা অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে” – বলছিলেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক রওনক জাহান।

তার ভাষ্যমতে, “তখন চাকরির সুযোগ বলতে একমাত্র সরকারি চাকরিই ছিল। কিন্তু উর্দু যদি রাষ্ট্রভাষা হয় তাহলে সরকারি চাকরি বা সেনাবাহিনীতে চাকরি পেতে বাঙালিদের নতুন ভাষা- উর্দু শিখতে হবে, উর্দুভাষীদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে – ফলে তাদের ডিসএ্যাডভান্টেজ হয়ে যায়।

ফলে ছাত্র ও বেকারদের জন্য এটা ছিল ভবিষ্যতের প্রশ্ন।”

‘অশিক্ষিত ও চাকরির অযোগ্য’

তমদ্দুন মজলিস  সেসময় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিল।

এ পুস্তিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন, দৈনিক ইত্তেহাদের সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ, এবং তমদ্দুন মজলিস প্রধান অধ্যাপক আবুল কাসেমের নিবন্ধ ছিল।

আবুল মনসুর আহমদ লিখেছিলেন, “উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করা হইলে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত শিক্ষিত সমাজ রাতারাতি ‘অশিক্ষিত’ ও সরকারি চাকুরির ‘অযোগ্য’ বনিয়া যাইবেন” – ঠিক যেমনটা ঘটেছিল ব্রিটিশরা ফার্সীর জায়গায় ইংরেজি ভাষাকে ভারতের রাষ্ট্রীয় ভাষা করার পর ভারতের মুসলিম শিক্ষিত সমাজের ক্ষেত্রে।

“ভাষার প্রশ্নটি যে “পাকিস্তানের এক অংশের ওপর আরেক অংশের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ আধিপত্য বিস্তারের সাথে জড়িত” এই বোধ তখন সবার মধ্যে জন্মাতে আরম্ভ করেছে – বলে জানিছিলেন আবুল মনসুর আহমদ ।

পূর্ব-পশ্চিম সম্বন্ধের ‘অবসান’

ওই পুস্তিকায় কাজী মোতাহার হোসেন তার নিবন্ধে একটি চমকপ্রদ কথা ব্যাক্ত করেছিলেন ।

তিনি লিখেছিলেন, “…যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানেরর উপর রাষ্ট্রভাষা রূপে চালাবার প্রচেষ্টা করা হয়, তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে। এর কারণ ধূমায়িত অসন্তোষ বেশী দিন চাপা থাকতে পারে না । শীঘ্রই তাহলে পূর্ব-পশ্চিমের সম্বন্ধের অবসান হবার আশংকা রয়েছে। “

এর অর্থ, উর্দুকে যদি রাষ্ট্রভাষা করা হয় তাহলে পাকিস্তানের বাঙালিদের ক্ষোভ যে এক সময় জাতীয়তাবাদী চিন্তায় রূপ নেবে এবং তা যে পাকিস্তানের ২ অংশের বিভক্তি ডেকে আনতে পারে – ড. হোসেন তা তখনই অনুভব করেছিলেন।

‘পাকিস্তানকে ধ্বংসের’ ষড়যন্ত্র

মি. জিন্নাহর মত পাকিস্তানের অন্যান্য নেতারাও তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে হয়ত ঠিক একই আশংকাটিই করেছিলেন।

মি. জিন্নাহ ঢাকায় দেয়া তার ভাষণগুলোতে বার বার উল্ল্যেখ করেছিলেন যে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি যারা করছে তারা ‘প্রাদেশিক’ মানসিকতায় আক্রান্ত, এবং উর্দু একমাত্র রাষ্ট্রভাষা না হলে তা পাকিস্তানের ‘ঐক্য-সংহতি ও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য’ নষ্ট করবে।

তিনি আরও বলেছিলেন যেসকল লোক রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার কথা বলছে, তারা পাকিস্তানকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের অংশ।

মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ সেসময় ঢাকায় যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তার অংশবিশেষ প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ইন্টারনেটে শুনতে পাওয়া যায়।

বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন ‘পাকিস্তানের সকল প্রান্তের লোকই উর্দু বোঝে, সর্বোপরি অন্য যে কোন প্রাদেশিক ভাষার চাইতে ভালোভাবে ইসলামের সংস্কৃতি এবং মুসলিম ঐতিহ্যকে ধারণ করে উর্দু, আর তা অন্য ইসলামী দেশগুলোয় ব্যবহৃত ভাষাগুলোর সবথেকে বেশি কাছাকাছি। ‘

কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই যে বাঙালি এবং তাদের মূল ভাষা যে বাংলা – এ সম্পর্কে মি. জিন্নাহর ধারণা ছিল খুবই কম।

তার ধারণা ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই উর্দুভাষী। যদিও মি. আলী জিন্নাহ নিজেই ছিলেন একজন গুজরাটি বংশোদ্ভুত, তিনি ইংরেজিতে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন, কিন্তু উর্দু ভালোমত জানতেন না।

পাকিস্তানের সবাই উর্দু বোঝে জিন্নাহর এ ধারণা হবার কারণ-

“পূর্ববঙ্গের উর্দুভাষী নওয়াব বা এরকম এলিট শ্রেণীর মানুষদের সাথেই মূলত মি. জিন্নাহর ওঠাবসা ছিল।

তারা সবাই তার সঙ্গে উর্দুতে আলাপ করত, কিন্তু তার বাইরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে আসলে বাংলাভাষী, তারা যে উর্দু বলে না, বলতে পারে না বা তাদের জানা ছিল না – তা তার অজানা ছিল” – বলছেন অধ্যাপক রওনক জাহান ।

স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা

ভাষা-বিতর্কে প্রতিদ্বন্দ্বী ২ পক্ষেই এ সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছিল যে এ সমস্যার যথাযথ নিষ্পত্তি না করলে তা এক সময় গিয়ে পাকিন্তানের ঐক্য বিপন্নের কারণ হতে পারে।

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরপরই এ সংঘাত আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল।

রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে সংঘাত থেকেই কি তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল?

রওনক জাহান বলছিলেন, ভাষা-সংস্কৃতি ভিত্তিক একটা জাতীয়তার বোধ বাঙালিদের মধ্যে প্রথম থেকেই ছিল, কিন্ত কেন্দ্রীয় সরকার হিসেবে পাকিস্তান শাসন করার আগ্রহ তেমন একটা ছিল না।

রওনক জাহান বলছিলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ধর্মের কথা থাকলেও তার মূল বার্তাটি ছিল এই যে মুসলিমদের স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্র গঠিত হলে তাদের পশ্চাৎপদতা কাটবে।

এবং হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের আধিপত্য থেকে তারা মুক্তি পাবে আর অর্থনৈতিক ভাবে উন্নয়নের দ্বারও খুলে যাবে।

”বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে পাকিস্তানের দাবি মূলত এ কারণেই অতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সে আকাঙ্খা পূরণের সম্ভাবনা বিন্দুমাত্রও দেখা গেল না।

আর রাষ্ট্রভাষার দাবিও যখন পূরণ হচ্ছিল না তখন খুব সহজেই বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ এবং ক্রোধ বাসা বাধে,” তিনি বলেন।

তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের গবেষক ও ইতিহাসবিদ আফসান চৌধুরী বলছেন, ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন এর মত বড় ঘটনা মূলত এর সূচনা হয়ে গিয়েছিল ১৯৪৮ থেকেই।

”তবে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে থাকেন – তারা ভাষা আন্দোলন থেকেই এর শুরু এরকমটাই মনে করেন,” মি. চৌধুরী বলেন।

‘একমাত্র’ না ‘অন্যতম’ রাষ্ট্রভাষা

মোহাম্মদ আলি জিন্নাহসহ আরও যারা উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার কথা জানিয়েছিলেন তাদের অধিকাংশেরই কথা ছিল – উর্দুই হবে পাকিস্তানের ‘একমাত্র’ রাষ্ট্রভাষা।

আর যারা রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবি করছিলেন, এদের মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরণের মত।

কেউ কেউ বলছিলেন, পাকিস্তানের প্রধান রাষ্ট্রভাষাই হতে হবে বাংলা ভাষা, কারণ গোটা পাকিস্তানে বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।

অন্য কেউ বলছিলেন, বাংলা ও উর্দু দুটিই হবে রাষ্ট্রভাষা, বাংলা হবে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা।

আবার কেউ বলছিলেন, বাংলা হবে পূর্ব পাকিস্তানের শুধুমাত্র সরকারি কাজে ব্যবহৃত ভাষা, তবে ২ অংশের মধ্যে যোগাযোগের বাহন হিসেবে উর্দু ব্যবহার হবে ও আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষাও থাকবে।

কিন্তু তাদের সবারই অভিন্ন অবস্থান ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের প্রধান ভাষা হতে হবে বাংলা ভাষা।

গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি

‌ভাষা নিয়ে টানাপোড়েনের এ সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে করাচিতে।

পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদ অধিবেশন সংগঠিত হয়েছিল – ১৯৪৮ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি।

তাতে গণপরিষদ কার্যক্রমে উর্দু ও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষাও যেন ব্যবহার করা যায় – এমন এক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

মি. দত্তের যুক্তি ছিল – পাকিস্তানে অবস্থিত ৬ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৪ কোটিরও বেশি মানুষের ভাষা বাংলা – অর্থ্যাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই ছিল বাংলা।

তাই বাংলাকে পাকিস্তানের শুধুমাত্র একটি প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে দেখা উচিত নয়, বাংলারও হওয়া উচিত পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা।

কিন্তু মি. দত্তের এ সংশোধনীর প্রস্তাব গণপরিষদে গৃহীত হয়নি। এমনকি গণপরিষদের সংশ্লিষ্ট বাঙালি সদস্যরাও সংসদীয় দলের আপত্তির কারণবশত তাকে সমর্থন করতে পারেননি।

ভাষা পরিবর্তন না করার প্রতিবাদে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন ও ধর্মঘট করে আন্দোলন করে।

১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ পূর্ব বাংলায় পালিত হয় ‘ভাষা দিবস’।

বায়ান্নর ভাষা অন্দোলন
বায়ান্নর ভাষা অন্দোলন

সে ধর্মঘটে পুলিশ যে আন্দোলনকারী নেতাদের গ্রেফতার করে তাদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, অলি আহাদের মতো নাম না জানা আরো অনেকে, আর শেখ মুজিবুর রহমান – পরে যিনি হয়েছিলেন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতা এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি।

এসকল নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৩-১৫ই মার্চ ঢাকায় ধর্মঘটও পালিত হয়েছিল।

২ দিন পর খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রদের এক বৈঠক সংগঠিত হয়, এতে চুক্তি হয় যে তার সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পাকিস্তানের গণপরিষদকে অনুরোধ করবে।

এই রকম বিক্ষুব্ধ পরিবেশের মধ্যেই মাত্র ১০ দিন পর ঢাকায় আসেন মি. জিন্নাহ, আর সম্ভবত এর ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেই তিনি তার বক্তৃতায় ‘বিভ্রান্তি সৃষ্টির’ কথাটি উল্ল্যেখ করেছিলেন।

একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ – মহান ভাষা আন্দোলন এর ক্ষণ-

কিন্তু প্রতিবাদ-বিক্ষোভ, মিটিং-মিছিল, চুক্তি, স্মারকলিপি, পার্লামেন্টে বিতর্ক – এসব কিছুই দৃশ্যত তেমন কোন কাজ আসেনি।

মি. আলী জিন্নাহ’র মৃত্যুবরণ করার পরও রাষ্ট্রভাষা নিয়ে কয়েক বছর যাবৎ নানা রকম প্রস্তাব-পাল্টা প্রস্তাব, সংবাদপত্র-সভাসমিতিতে বিতর্ক চলতে থাকে। ।

১৯৫২ সালের শুরু পর্যন্ত বাঙালি রাজনীতিবিদদের অধিকাংশই জোরালো ভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উর্দুর বিরুদ্ধে মনোভাব ব্যক্ত করতে থাকেন।

এনিয়ে ভাষা বাংলা করার দাবিতে থেমে থেমে আন্দোলন-ও চলমান ছিল ।

এরই মধ্যে খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন।

তিনি ১৯৫২ সালের ২৭ শে জানুয়ারি এক সভায় বক্তৃতা দিলেন – যার ফলে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার আন্দোলন আবার নতুন করে জ্বলে ওঠে।

পূর্ব-বঙ্গের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও খাজা নাজিমুদ্দিন সেই বক্তৃতায় ব্যাক্ত করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, এবং দুটি রাষ্ট্রভাষা একত্রে নিয়ে কোন রাষ্ট্র সমৃদ্ধির পথে এগুতে পারে না’।

সেই সভায় তিনি আরো বলেন, পূর্ব বঙ্গের প্রায় ২৭টি শিক্ষাকেন্দ্রে এর মধ্যেই আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রক্রিয়া চালু হয়ে গিয়েছে।

এর ফলে আবার নতুন করে আরম্ভ হয় ভাষা নিয়ে আন্দোলন, ছাত্র বিক্ষোভ, ধর্মঘট এবং হরতাল।

গঠন করা হয় সর্বদলীয় একটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদ।

২১শে ফেব্রুয়ারি হতে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন।

কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতারা স্থির করেন – তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন।

আজকের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন নামে পরিচিত ছিল।

সেখানে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বিক্ষোভকারীরা ১৪৪ ধারা ভাঙতে গেলে পুলিশ ছাত্রদের গ্রেফতার করে, এবং পরে কাঁদুনে গ্যাসও নিক্ষেপ করে।

দুপুরের পর বিক্ষোভরত ছাত্রদের একটি দল গণপরিষদ ভবনের দিকে যাবার প্রচেষ্টা করলে পুলিশ তখন গুলিবর্ষণ  শুরু করে।

মূলত এই দিনকে কেন্দ্র করেই বাঙালীর ভাষা আন্দোলন বিভিন্ন বই-পুস্তকে, স্মৃতিপটে ইতিহাস রচনা করা হয়।

এবং বাঙালী দিনটিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে।

পরবর্তীতে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সেই স্মরণীয় দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র হিসেবে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে কর্মরত ছিলেন মুহাম্মদ মাহফুজ হোসেন।

তিনি বলছিলেন, “একুশে ফেব্রুয়ারি দুপুরে গুলিবিদ্ধ ৩ জনকে হাসপাতালে গ্রহণ করি আমি।

কপালে গুলিবিদ্ধ রফিককে দেখার সাথে সাথেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়, আর উরুতে গুলিবিদ্ধ আবুল বরকত মৃত্যুবরণ করেন রাতে, আমার চোখের সামনেই।”

পর দিন-  ২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার কয়েকটি জায়গায় আবার পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে।

গোলাগুলিতে সরকারি হিসেবে ৪ জন নিহত হবার কথা বলা হয়। কিন্তু ২ দিনের সংঘাতে ঠিক কতজন আসলে নিহত হয়েছিলেন তার সঠিক সংখ্যা এখনো সবার অজানা।

আরো পড়ুন: 
আল জাজিরার ঢাকা মাফিয়া – ভাইরাল নেট দুনিয়া! 
নতুন যাত্রার সূচনা দেশীয় ল্যাপটপ ব্র্যান্ড দোয়েল এর 
নেটফ্লিক্সে বাংলাদেশ ট্রেন্ডিংয়ে শীর্ষে ফারুকীর ‘ডুব’

ভাষা আন্দোলনে নিহত শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ, তা ভেঙে ফেলা এবং পরে পুণঃনির্মাণ, ২১শে ফেব্রুয়ারী নিয়ে গান ও কবিতা রচনা – এগুলোর মাধ্যমে কয়েক বছরের মধ্যেই বাঙালির এক প্রতীকী সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি।

আফসান চৌধুরী বলছিলেন, “শহীদ মিনার বানানোর মূল বিষয়টি ছিলো – এই যে প্রতীক তৈরি হওয়া, ইতিহাসের মধ্যে এরকম প্রতীকায়ন থাকতে হয়, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ভাষা আন্দোলন এটা করতে পেরেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভেতর থেকে ‘আমি পাকিস্তানি’ এই বোধটা দূর্বল করে রেখেছে ভাষা আন্দোলন ।

শিক্ষিত সকল গোষ্ঠীর চোখ খুলে দিয়েছে ভাষা আন্দোলন, তাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। “

মুসলিম লিগের নির্বাচনী পরাজয়

একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের ঘটনার পর মুসলিম লিগ সরকারের প্রতিক্রিয়া জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের উদ্ভব করে।

যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ১৯৫০এর দশক জুড়ে বড় রকমের পরিবর্তন এবং মেরুকরণ ঘটে যায়।

এর আগে ১৯৪৯ সালে খাজা নাজিমুদ্দিনের বিরোধীরা মুসলিম লিগ থেকে বের হয়ে গিয়ে মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মত নেতারা আওয়ামী মুসলিম লিগ নামে নতুন একটি দল গঠন করেছিলেন – যা পরবর্তীতে আওয়ামী লিগ নামে পরিণত হয়।

১৯৫৪ সালে আওয়ামী লিগ ও অন্যান্য দল একত্রে গঠিত যুক্তফ্রন্ট পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক নির্বাচনে ২৭০টি আসনের ২২৩টিতেই জয়যুক্ত হয়।

যে পূর্ববঙ্গের ঢাকায় ১৯০৬ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের জন্মলাভ করেছিল – সেই পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতেই মুসলিম লিগ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

এত বিক্ষোভ-আন্দোলন, সভা-সমাবেশের পর অবশেষে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু এবং বাংলা – এই দুই ভাষাকে স্থান দেয়া হয়।

স্বাধীনতার চেতনা জন্ম নেওয়ার ক্ষণ-

কিন্তু পাকিস্তানের ২ অংশের ভেতরে বৈষম্য ক্রমশই স্পষ্টত হয়।

অর্থনীতি, বাজেট বরাদ্দ, সরকারি চাকরির সুযোগ-সুবিধা, রাজস্ব ও কর – এরকম গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য আর পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করার ব্যাপারটি রাজনীতিতে প্রধান ইস্যু হয়ে দাড়ায়।

রওনক জাহান বলছেন, বাঙালিরা যে পৃথক, এই আত্মপরিচয়, এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অংশ হয়ে যে থাকা যাবে না, এ অনুভূতিটা প্রথম থেকেই ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে।

”এটা ছিল ভাষাভিত্তিক আত্মপরিচয়। অমর্ত্য সেন বলেছেন, মানুষের বিভিন্ন রকম আইডেনটিটি রয়েছে। আমরা মুসলমান – সেটা হয়তো ৪৭ সালের আগে বেশ জোরালো ছিল।

কিন্তু ৪৭-এর পর থেকে আমাদের ভাষাভিত্তিক পরিচয়টাই যেন প্রধান হয়ে উঠেছে,” রওনক জাহান। বলেন।

রওনক জাহান আরও বলছিলেন,”ভাষার দাবি তো ১৯৫৬এ তারা মেনেই নিয়েছিল।

কিন্তু তারপর হঠাৎ আবার ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করা হলো, মেয়েদের টিপ দেওয় বারণ করা হলো – এসব যখন শুরু হলো, তখন এর বিরুদ্ধে সংস্কৃতিকর্মীদের আন্দোলন আরম্ভ হলো।”

“আর ৬ দফা ঘোষিত হবার পর থেকে পূর্ববঙ্গে গাড়ির নাম্বার প্লেট, দোকানের সাইনবোর্ড – এসব বাংলায় করা আরম্ভ হতে লাগলো।”

আফসান চৌধুরীর মতামত, ভাষা আন্দোলন বড় ঘটনা হলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মূল দ্বন্দ্ব ছিল আসলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে।

“খেয়াল করে দেখুন ১৯৫৬ সালে বাংলা তো পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হয়ে গেল কিন্তু কই বাঙালির আন্দোলন তো থামলো না। শেখ মুজিব ৬ দফা দিয়েছিলেন কেন? কারণ আমাদের মূল দ্বন্দ্বটা ছিল আসলে অর্থনৈতিক।”

আফসান চৌধুরী বলছিলেন, পূর্ববঙ্গের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্খা বাস্তবে রূপান্তর হতে থাকে ১৯৫৮ সালের পর থেকে।

“শেখ মুজিব ১৯৬৬ সালে ঘুমন্ত আকাঙ্খাটাকে আন্দোলনে পরিণত করে রাস্তায় নিয়ে গেলেন।

তিনি ১৯৪০ এর দশক থেকে রাজনীতি করছেন, তাই বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্রের আকাঙ্খার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তার পরিপূর্ণ জ্ঞান ও ধারণা দুটিই ছিল।

বাঙালীর স্বার্থে ৬ দফা দাবি পেশ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব
বাঙালীর স্বার্থে ৬ দফা দাবি পেশ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

তার সঙ্গে ৬ দফার ধারণা মিলে যায়। তাই তিনি যখন ৬ দফা দাবি পেশ করেন – তিনি ‘আলাদা দেশ’ এই কথাটা স্পষ্ট করে বলছেন না, কিন্তু এটা পরিষ্কার আলাদা দেশের কথাই, শুধু ফ্ল্যাগ ওড়ানোর কথা নেই।

“আমি মনে করি, ৬ দফার পর আর পাকিস্তানের টিকে থাকা সম্ভব হতো না” – বলছিলেন আফসান চৌধুরী।

curious

শেয়ার করুন -

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন