আসবাবপত্র তৈরি উপযোগী সুপরিচিত উদ্ভিদ – সেগুন গাছ

আসবাবপত্র তৈরি উপযোগী সুপরিচিত উদ্ভিদ - সেগুন গাছ
আসবাবপত্র তৈরি উপযোগী সুপরিচিত উদ্ভিদ - সেগুন গাছ

সেগুন গাছ এমন একটি গাছ যা গাছ হিসেবে যতটা না পরিচিত তার থেকেও বেশি পরিচিতি আসবাব পত্রের ব্যবহার উপযোগী কাঠ হিসেবে।

সেগুন গাছ এর কাঠ অত্যন্ত শক্ত হয়। এবং পোকা-মাকড় কম ধরে। তাই আসবাবপত্রে এর ব্যবহার সেই আদিকাল থেকেই।

আজ আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু অতি সুপরিচিত এই উদ্ভিদ সেগুন গাছ ।

নামকরণ:

সেগুন গাছের ইংরেজি নাম Teak Tree.

বৈজ্ঞানিক নাম:

এর বৈজ্ঞানিক নাম Tectona grandis.

পরিবার:

সেগুন Lamiales বর্গের Lamiaceae পরিবারের অন্তর্ভূক্ত বিরাট একটি উদ্ভিদ।

প্রজাতি:

সেগুন হল নিরক্ষীয় এবং ক্রান্তিয় অঞ্চলের এক প্রজাতির গাছ।

উৎপত্তিস্থান:

সেগুন গাছ এর আদি নিবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায়।

সম্পূর্ণ পৃথিবীর মোট সেগুন কাঠের যোগানের একতৃতীয়াংশই ‍উৎপাদন হয় মায়ানমারে।

প্রাপ্তিস্থান:

সেগুনের আদি নিবাস মায়ানমার হলেও পৃথিবীর আরও বিভিন্ন দেশগুলোতেও বর্তমানে এ গাছের দেখা পাওয়া যায়।

এবং বর্তমানে এটি বাণিজ্যিক ভাবে চাষও করা হয়। সেসব দেশের মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হল আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশসমূহ ।

বাংলাদেশেও সেগুন গাছ এর  চাষ হয়। ১৮৭১ সালে প্রথম চট্টগ্রাম জেলার কাপ্তাই-এ সেগুন গাছ রোপণ করা হয়।

এরপর ১৮৭৩ সাল থেকে চট্টগ্রাম সহ পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভিন্ন বনাঞ্চলে সেগুন গাছ লাগানো আরম্ভ হয়।

বর্তমানে দেশের প্রায় সর্বত্রই উন্নতমানের কাঠের বৃক্ষ হিসেবে সেগুন গাছ বপন এবং চাষ করা হচ্ছে।

আকার-আকৃতি:

সেগুন গাছ প্রচুর লম্বাকৃতির। এ গাছের উচ্চতা প্রায় ৪০ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে ।

গাছের কান্ডগুলো ধূসর বাদামি রংয়ের হয়ে থাকে। সেগুন গাছের পাতা অনেকটা ডিম্বাকৃতির এবং মাঝে বেশ চওড়া।

এ গাছের পাতা আকারে বড় এবং পাতার পেছন দিকে ছোট ছোট আঁশ থাকে।

পাতার দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৫–৪৫ সে.মি. অর্থ্যাৎ ৫.৯–১৭.৭ ইঞ্চি এবং প্রস্থে ৮–২৩ সে.মি. বা ৩.১–৯.১ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়।

সেগুন গাছের পাতা শক্ত বোটা দ্বারা কান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই বোটা গুলো দৈর্ঘ্যে ২–৪ সে.মি. বা ০.৮–১.৬ ইঞ্চি আকারের হয়ে থাকে। পাতার প্রান্তগুলো হয় সমান।

এগাছের ফুল অত্যন্ত সুগন্ধিযুক্ত। সাদা এ ফুল গুলো ২৫–৪০ সে.মি. লম্বা আর ৩০ সে.মি. ছড়ানো গুচ্ছের মধ্যে জন্মায়। সাধারণত জুন থেকে আগস্ট মাসে সেগুন ফুল ফুটে থাকে।

সেগুন্ গাছ আকারে প্রচুর লম্বা হয়ে থাকে। গাছের ডিম্বাকৃতির পাতা রয়েছে। এবং ফুল ও ফল হয়।

সেগুন গাছের ফুল রয়েছে। যা আকারে ছোট, সাদা রঙবিশিষ্ট, নক্ষত্র আকারের, বৃন্তযুক্ত এবং সুগন্ধ যুক্ত।

ফুলের পরে সেগুন গাছে ফল আসে। ফল শক্ত, আকারে কিছুটা গোল।

ফলের ব্যাস প্রায় ১ সেমি, অমসৃণ প্রকৃতির। ১ টি ফলে ১-২টি বীজ থাকে।

ফলগুলো পরিপক্ব হয়ে অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসের ‍দিকে গাছ থেকে ঝরে পড়ে।

এই বীজ থেকে চারা গাছ জন্মানো সম্ভব।

বৈশিষ্ট্য:

সেগুন গাছ একটি বৃহৎ পর্ণমোচী বা পাতাঝরা জাতীয় উদ্ভিদ বেশিরভাগ শক্তকাঠের মিশ্রবনভূমিতে পরিলক্ষিত হয়।

সেগুন গাছের কাঠ বেশ শক্ত হয় বলে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

পরিণত বয়সে সেগুন গাছের গুঁড়ির (১.৫-২ মিটার উচ্চতায়) ১-১.২৫ মি ব্যাস পর্যন্ত হয়ে থাকে।

দারুবৃক্ষরাজি মধ্যে সেগুন গাছ সর্বোত্তম।

প্রথম কাটা কাঠ সোনালি হলুদ বর্ণের হয়। এবং ক্রমে তা আরও গাঢ় রং ধারণ করে।

সেগুন কাঠ খুবই শক্ত, দৃঢ়, ভারি, টেকসই এবং উত্তম পালিশযোগ্য হয়ে থাকে। এই কাঠ ঘুণে বা অন্য কোন পোকা সহজে আক্রমণ করে না।

সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি আসবাবপত্র
সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি আসবাবপত্র

একারণে আসবাবপত্র তৈরিতে সেগুন কাঠের ব্যবহার আদিকাল থেকে খুবই সমাদৃত।

সেগুন কাঠের গুণাগুণ:

সেগুন কাঠ যে শুধুই আসবাব তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়, তা নয়।

এছাড়াও এর আরও বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে যেমন-জাহাজ নির্মাণ, বাড়ির দরজা-জানালা, রেলের বগি, বাদ্যযন্ত্র, জাহাজের মাস্ত্তল ইত্যাদি তৈরি করতেও সেগুন কাঠের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।

সেগুন গাছের কচি পাতা এবং মূলের বাকল থেকে লাল রং তৈরি করা হয়।

আরো পড়ৃন:
চন্দন গাছ; অতি সুগন্ধী একটি উদ্ভদ
মনমাতানো সৌরভে ভরা বেলী ফুল গাছ
পাথরকুচি গাছ; বিভিন্ন গুণে গুণাণ্বিত এক উদ্ভিদ

বাংলাদেশে প্রতি বছরে প্রাপ্ত মোট ৬০,৬৫,০০ ঘনফুট কাঠের মধ্যে বড় এক অংশই আসে সেগুন গাছ থেকে।

শুধু তাই নয়। সেগুন গাছে রয়েছে নানান ঔষধি গুণাগুণও। এগাছের সবকিছুই ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

১। সেগুন গাছের বাকল ছিলে তা পানিতে ভিজিয়ে সেবন করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে থাকে।

২। সেগুন গাছের বাকলের নির্যাস অত্যন্ত শক্তিবর্ধক। তাই সেগুন গাছের বাকল সিদ্ধ করে খেলে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়।

৩। সেগুন গাছের মূল ক্যান্সার প্রতিরোধক। তাই মূল গুঁড়ো করে খাওয়া হয়।

৪। সেগুন গাছের বীজের সাদা অংশ থেকে তেল তৈরি করা হয়। এই তেল ভেষজ কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৫। পাখির আক্রমন থেকে ফসল বাঁচাতে হলে সেগুন গাছের ডাল কলম করে লাগিয়ে চাড়ার মত করে ক্ষেতের পাশে লাগালে পাখির আক্রমন থেকে বাঁচা যায়। এই গাছে পাখি বাসা বাধে না এমনকি বসেও না।

curious

শেয়ার করুন -

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন