বনসাই উদ্ভিদ- জীবন্ত শীল্পকর্ম বলা হয় যেটিকে

বনসাই উদ্ভিদ- জীবন্ত শীল্পকর্ম বলা হয় যেটিকে
বনসাই উদ্ভিদ- জীবন্ত শীল্পকর্ম বলা হয় যেটিকে

বনসাই উদ্ভিদ এতই নান্দনিক যে একে জীবন্ত শিল্পকর্ম বলা হয়। প্রচীন কাল থেকে শুরু করে বর্তমানেও খুবই জনপ্রিয় বনসাই।

বনসাই এমন এক কৌশল, যা প্রয়োগ করে বিরাট উদ্ভিদকে ছোট্ট একটি টবে খর্বাকৃতির করে রাখা হয় বছরের পর বছর।

বনসাই শব্দের উৎপত্তি:

বনসাই’ শব্দটি একটি জাপানী শব্দ। প্রাচীন চীনা শব্দ ‘পেনজাই’ থেকে এই শব্দের উৎপত্তি।

বনসাই করতে ব্যবহৃত যে ট্রের মত যে পাত্র ব্যবহৃত হয় তাকে সাধারণত ‘বন’ বলা হয়।

পাশ্চাত্যে পাত্রে খর্বাকৃতির গাছ ‘বনসাই’ হিসেবে পরিচিত।

বনসাই উদ্ভিদ এর ইতিহাস:

টবে গাছ উৎপাদন বহু প্রাচীন কাল থেকেই চলে আসছে। তবে বনসাই এর আগমন আরও বেশ কিছুকাল পরে।

২৬৫-৪২০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে জিন সাম্রাজ্যের লেখালেখিতে প্রথম ‘পেনজাই’ শব্দের উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়।

বিভিন্ন সময়ে চীনের বিভিন্ন স্থানে, জাপানে, কোরিয়াতে, ভিয়েতনামে এমনকি থাইল্যান্ডেও নানান আকারে বনসাই উদ্ভিদ এর চর্চা বিস্তার লাভ করে।

চৈনিক ছং রাজবংশের সময়কালে জাপানে পাত্রে উৎপাদিত গাছের পরিচিতি লাভ করে এবং জনপ্রিয়তা পায়।

পাত্রের ক্ষুদ্র উদ্ভিদকে ওই সময় ‘হাচি-নো-কি’ বা গামলার গাছ বলা হতো।

জনৈক জাপানী জেন পুরোহিত, কোকান শিরেন-এর লেখা ‘ক্ষুদ্রাকৃতি বৃক্ষরাজির বাগান নিয়ে লেখা গদ্য’ বইয়ে ‘বনছেকি’ বা বনসাই সম্পর্কে এবং এর নান্দনিক বৈশিষ্ট্য ও এর বাগান তৈরির পরিকল্পনার আলোচনা পাওয়া যায়।

মোটামুটি ১৮০০ সাল নাগাদ জাপানীরা তুলনামূলক অগভীর পাত্রে ক্ষুদ্র গাছ পরিচর্যা করার সঙ্গে সঙ্গে চৈনিক ‘পেনজাই’ শব্দের উচ্চারণ পরিবর্তন করে ফেলে।

টকিয়োর রাজশিক প্রাসাদে থাকা অনেক পুরানো এবং জীবিত একটি বনসাই উদ্ভিদকে এখনো জাপানের জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বনসাই স্টাইল:

বনসাই উদ্ভিদের বিভিন্ন স্টাইল রয়েছে, যেমন:Informal Upright, Formal Upright, Root Over Rock, Broom, Cascade, Semi Cascade, Multi Trunk, Clump Style, Landscape, Forest Style, Exposed Root style প্রভৃতি

বনসাইয়ের প্রকারভেদ:

আকারের উপর ভিত্তি করে বনসাইকে ১১ ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন:

১. টুইনট্রাংক বনসাই: বনসাই উদ্ভিদ টবের উপর বা উদ্ভিদের গোড়া হতে দুটি কান্ডের সৃষ্টি করলে তাকে টুইনট্রাংক বনসাই বলা হয়।

২. ট্রিপল ট্রাংক বনসাইঃ বনসাই উদ্ভিদ টবের উপর বা উদ্ভিদের গোড়া হতে তিনটি কান্ডের সৃষ্টি করলে তাকে ট্রিপল ট্রাংক বনসাই বলা হয়।

৩. মাল্টিট্রাংক বনসাইঃ  টবের উপর বা বৃক্ষের গোড়া হতে তিনটির বেশি কান্ডের সৃষ্টি করলে তাকে  মাল্টিট্রাংক  বনসাই বলা হয়।

৪. ডেড উড বনসাইঃ এক্ষেত্রে বনসাই এর পাতা সবুজ হলেও কান্ড মৃত কান্ডের ন্যায় সাদা অথবা অন্য যেকোন মৃত বর্ণের হয়ে থাকে।

তাই এধরনের বনসাই কে ডেড উড বনসাই বলে।

৫। ফরমাল বনসাইঃ সাধারণ মানের যেসকল বনসাই তৈরি হয় সেগুলোকে ফরমাল বনসাই বলাহয়।

৬। এনফরমাল বনসাইঃ  এনফরমাল বনসাই এর কান্ড গুলোতে সাধারণত ভাজ থাকে।

৭। লিটারেটি বনসাইঃ কান্ড সাধারণত সরু হয় এবং মাথায় ভাজ থাকে এবং সামান্য পরিমাণে পত্রক দেখা যায়।

৮। রুট এক্সপোজ বনসাইঃ এধরনের বনসাই তৈরির সময় গাছের প্রায় অর্ধেক অংশে শিকর প্যাচানো অবস্থায় রাখে।

৯। রুট ওভার রকঃ এধরনের বনসাইয়ে মূলের উপর বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। মূল ঘড়ির কাটার দিকে প্যাচানো থাকে।

১০। সেমিচ্যাসিড বনসাইঃ এপ্রকারের বনসাই উদ্ভিদ প্রথমে টব হতে সামান্য উপরে উঠে এবং পরবর্তিতে তা আবার এক পাশে হেলে গিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করে।

দেখতে অনেকটা কোন পাহাড়ের ঢালে যে ভাবে গাছ নিচের দিকে নেমে আসে ওরকম।

১১। উইন্ডস্টেপ বনসাইঃ বড় ধরনের বায়ু প্রবাহ বা ঝড়ের মধ্যে পড়লে সমগ্র বৃক্ষ যেমন বাতাসের ধাক্কায় বাতাসের দিকে হেলে যায় ঠিক তেমন গড়নের বনসাইকে উইন্ডস্টেপ বনসাই বলে।

বনসাই উদ্ভিদ
বনসাই উদ্ভিদ

বিভিন্ন ফরমুলা:

সঠিকভাবে বনসাই করতে বেশ কিছু ফরমূলা মেনে আগাতে হয়। যেমন-

  • গাছ নির্বাচন: একটি উদ্ভিদ কে বনসাই উদ্ভিদ হিসেবে পরিণত করতে হলে সর্বপ্রথম উপযুক্ত গাছ নির্বাচন করতে হবে। আর এই উপযুক্ত নির্বাচিত গাছ গুলো যেমন-তেমন হলে চলবে না।

বনসাই এর জন্য এমন গাছ নির্বাচন করতে হবে যেগুলো তুলনামূলক অধিক আয়ুষ্কাল সম্পন্ন।

এগুলোর কান্ড, ডাল-পালা মোটা এবং শক্ত হতে হবে।

কোনপ্রকার নরম কান্ড বিশিষ্ট গাছ বা লতানো গাছ বাছাই করা যাবেনা।

  • গাছ ওয়ারিং: সাধারণ গাছকে বনসাই উদ্ভিদ-এ পরিণত করা হয় মূলত এই ওয়ারিং এর মাধ্যমে। এর মাধ্যমে গাছে তার পেঁচিয়ে গাছের বৃদ্ধি কমিয়ে রাখা হয়।

যার ফলে সাধারণ উদ্ভিদ বনসাই-এ রূপান্তরিত হয়।

  • বনসাই প্রুনিং: বনসাই প্রুনিং হচ্ছে গাছের ডাল-পালা ছাঁটা। বনসাই উদ্ভিদকে সঠিক স্টাইল দেয়ার জন্য প্রুনিং করা হয়।

এর মাধ্যমে বনসাই এর আকার আকৃতি ঠিক করা, বাড়তি ডাল-পালা ছেঁটে দেওয়া হয়।

  • সঠিক যন্ত্র ব্যবহার: উদ্ভিদের সঠিক আকৃতি দিতে এটি কাটা, ছাঁটাই করা বা পরিচর্চার জন্য অবশ্যই সঠিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা জরুরী।

বনসাই তৈরির পদ্ধতি:

  • বনসাইয়ের চারা সংগ্রহ:

বনসাই তৈরির প্রধান এবং প্রাথমিক কাজ হলো চারা সংগ্রহ। বিশেষজ্ঞের মতানুসারে, বট, তেঁতুল, জাম্বুরা, নিম, শিমুল, আমলকি, নিম, পলাশ, বতাবীলেবু, নরশিংধ, বেগেনভিলিয়া, অশ্বথ, করমচা, কৃষ্ণচূড়া, অর্জুন, রেনট্রি প্রভৃতি উদ্ভিদ বনসাই তৈরির উপযুক্ত। তবে বটবৃক্ষ সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

কারণ এর সুবিধা হলো টবেও এই গাছের ঝুরি নামে। টবের ছোট্ট গাছে ঝুরি নামলে দেখতে চমৎকার লাগে।

এবং একই সাথে উদ্ভিদটির প্রাচীনত্ব তথা বয়সের সাক্ষ্যও নজরে আসে।

তবে বীজ থেকে বনসাইয়ের চারা উৎপাদন করা সম্ভব নয়। উপযুক্ত গাছের ডাল সংগ্রহ করে ক্রনিং করে অথবা গুটি কলম তৈরি করার পদ্বতিতে ও বয়স্ক গাছের সুপরিণত ডাল থেকে গুটিকলমের চারা তৈরি করে বনসাই করা যায়।

  • গাছ সংগ্রহকালীন পরিচর্যা:

গাছ সংগ্রহ করার পর কাটা নালাটি বালি এবং পাতাপচা সার দিয়ে চারপাশ ভরাট করে দিতে হবে।

এরপর বৃষ্টি না হলে নিয়মিত সেচ দিতে হবে।

এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ব্যাভিষ্টিন ও ১ মিঃ লিঃ ডাইমেক্রন গুলে চারাগাছের সর্বত্র স্প্রে করে দিতে হবে।

এর ফলে রোগবালাই অথবা পোঁকা-মাকড় দ্বারা স্পর্শকাতর চারা আক্রান্ত হতে পারে না।

  • টব নির্বাচন:

বনসাইয়ের জন্য সঠিক টব নির্বাচন অত্যন্ত জরুরী।   প্রথম দিকে সহজলভ্য এবং দামেও সস্তা এমন টব বাছাই করাই ভাল।

লক্ষ্য রাখতে হবে যেন টবের উচ্চতা যেন ১০ সেঃ মিঃ এবং মুখের ঘের ১৫ সেঃ মিঃ হয়।।

তবে গাছ অনুযায়ী টবের আকৃতি পরিবর্তনশীল হতে পারে।

যদি মাটির টব ব্যবহার করার হয় তবে আগে তা ২৫- ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে।

টবের তলদেশে প্রতি ১.০৫ সেঃ মিঃ ব্যাসের জন্য একটি করে ছিদ্র হবে।

তারপর নির্দিষ্ট মাপ মত নাইলনের জাল বিছিয়ে নিয়মানুযায়ী মাটি দিয়ে টব ভর্তি করা হয়।

পরে নিজের পছন্দসই সুদৃশ্য পোড়ামাটির টব বা নকশা করা চীনামাটির টব ব্যবহার করা যেতে পারে।

  • টবের মাটি তৈরি:

টবের মাটি এমন রাখতে হবে যাতে মাটি অনেকক্ষণ ভেজা থাকবে অথচ অতিরিক্ত জল ধরে রাখবে না।

এতে বনসাই ঠিক মত বৃদ্ধি পাবে এবং পরিপূর্ণ খাবার পাবে।

  • টবে গাছ বসানো ও এর পরিচর্যা:

টবে গাছ বসানোর পূর্বে টবের মাটি এবং চারা গাছকে ২% ব্যভিষ্টিন মিশ্রণ দিয়ে ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।

তারপর চারা গাছটিকে টবের ঠিক মাঝখানে বসাতে হবে। শিকড়গুলো যদি সোজাভাবে টবে না ধরে তবে ধারলো ছুরির সাহায্যে সেগুলো প্রয়োজনমত কেটে সেরোটেক্র বি- ১ হারমোন লাগিয়ে দিলে গাছটি টবের মাটিতে দ্রুত লেগে যাবে।

পর্যাপ্ত পানি দিতে হবে। এক্ষেত্রে বৃষ্টি উত্তম, তবে বৃষ্টি পাতের সম্ভাবনা না থাকলে টবটিকে রাতে খোলা আকাশের নিচে রেখে দিতে হবে।

টবের জন্য সবসময় আলো বাতাস থাকে এমন জায়গা নির্বাচন করা বাঞ্ছনীয়।

আরো পড়ুন: 

তুলসী গাছ এবং এ সম্পর্কে কিছু তথ্য
রহস্যময় ক্যাকটাস উদ্ভিদ

বনসাই পরিচর্চা:

বনসাই ‍উদ্ভিদ এর সঠিক যত্ন এবং পরিচর্চা নেওয়া জরুরী। তাহলে এর স্থায়িত্বকাল বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘদিন সুন্দর থাকে।  এ জন্য প্রয়োজন-

  • নিয়মিত পানি দেওয়া: প্রয়োজন অনুসারে বনসাইয়ে পানি দিতে হবে। একেকটি বনসাই এর পানির চাহিদা একেক রকম। তাই উদ্ভিদের চাহিদা বুঝে নিয়মিত পানি দিতে হবে।

  • ছাটাই করা: উদ্ভিদের ডাল-পালা বৃদ্ধি পাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমাপের বাইরে গেলে বনসাইয়ের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে যায়।

   তাই নির্দিষ্ট সময় বুঝে সঠিক নিয়ম মেনে বনসাইয়ের ডাল-       পালা ক্রুনিং বা ছাটাই করতে হবে।

  • সঠিক ঔষধ ব্যবহার: ছাঁটাই এর পর কাটা স্থানে উদ্ভিদের বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। যেমন-পঁচন ধরা,পোঁকার আক্রমণ ইত্যাদি।                                                            এসব ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সঠিক ঔষধ বা সার ব্যবহার করতে হবে।

curious

শেয়ার করুন -

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন