পিঁপড়া বা পিঁপড়ে কিংবা পিপীলিকা – প্রাণী জগৎ

পিঁপড়া বা পিঁপড়ে কিংবা পিপীলিকা - প্রাণী জগৎ
পিঁপড়া

পিঁপড়া বা পিঁপড়ে কিংবা পিপীলিকা (Ant): পিঁপড়া হলো ফর্মিসিডি (Formicidae) গোত্রের অন্তর্গত সামাজিক কীট বা পোকা। কনুই-সদৃশ শুঙ্গ এবং গ্রন্থির মত যে কাঠামো দিয়ে তার সরু কোমড় গঠিত হয় তার মাধ্যমে পিঁপড়াকে সহজেই শনাক্ত করা যায়।

পিঁপড়া বা পিঁপড়ে উপনিবেশ তৈরি করে বাস করে যা প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি হওয়া কয়েক ডজন শিকারী পিঁপড়া থেকে শুরু করে বিশাল এলাকাজুড়ে বাস করা লক্ষ লক্ষ পিঁপড়ার সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে। পিঁপড়া ক্ষুদ্র হলেও আমাদের কর্মী হওয়ার শিক্ষা দেয়।

ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবার শিক্ষাও পাওয়া যায় পিঁপড়া থেকে। মানুষ ও পিঁপড়ার মাঝে একস্থানে মিল পাওয়া যায়। উভয়েই খাদ্য মজুত করে রাখে। সত্যিই ছোট্ট একটি প্রাণীও যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ভেবে অবাক হতে হয়।

পিঁপড়া বা পিঁপড়ে প্রজাতিঃ

এখন পর্যন্ত জানা প্রায় ২২,০০০ পিঁপড়া প্রজাতির মধ্যে ১২,৫০০ টির শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। আর এদের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৮,০০০ প্রজাতির পিঁপড়ার বর্ণনা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে মাত্র ২৫০ টি প্রজাতির কথা জানা গেছে। তবে এ দল নিয়ে এখনও তেমন কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয় নি। আমাদের দেশের বহু প্রজাতির পিঁপড়ার মধ্যে অধিক পরিচিত জাতগুলোকে সাধারণভাবে অনেক সময় লাল পিঁপড়া, কালো পিঁপড়া, ডেঁয়ো পিঁপড়া, বিষ পিঁপড়া, ক্ষুদে পিঁপড়া ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করা হয়।

শ্রেণিবিন্যাস ও বিবর্তনঃ

পিঁপড়ারা এদের ঘনিষ্ঠ প্রজাতি বোলতা, মৌমাছি ও সফ্লাইর মতো একই বর্গ হাইমেনপ্টেরা (Hymenoptera) বর্গের অন্তর্গত। এরা মধ্য-ক্রেটাশাস পর্যায়ে ১১ থেকে ১৩ কোটি বছর পূর্বে বোলতা জাতীয় প্রাণী অর্থাৎ ভেসপয়েড বোলতাদের একটি বংশধারা থেকে বিবর্তিত হয় এবং সপুষ্পক উদ্ভিদের উদ্ভবের পর বহুমুখী বিকাশ লাভ করে।

তবে জীবাশ্মের রেকর্ড থেকে জানা গেছে ১৫ কোটি বছর পূর্বে অর্থাৎ জুরাসিক যুগের শেষদিকেও নাকি তাদের অস্তিত্ব ছিলো। এরপর ১০ কোটি বছর পূর্বে সপুষ্পক উদ্ভিদের বিকাশের পর তারা আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে এবং আনুমানিক ৬ কোটি বছর পূর্বে বাস্তুতান্ত্রিক প্রতিপত্তি অর্জন করে। ১৯৬৬ সালে ই ও উইলসন এবং তার সহকর্মীরা অ্যাম্বারে ফাঁদে আটকে পড়া ক্রিটেশাস যুগের Sphecomyrma freyi প্রজাতির একটি পিঁপড়ার জীবাশ্ম আবিষ্কার করেন।

৮ (আট) কোটি বছরের পুরনো এই জীবাশ্মটিতে পিঁপড়া ও বোলতা উভয়ের বৈশিষ্ট্যই পাওয়া যায়। স্ফেকোমারমা সম্ভবত ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী সংগ্রাহক ছিলো। কিন্তু অনেকে মনে করেন Leptanillinae এবং Martialinae শ্রেণীর প্রাণীদের মতো প্রাচীন পিঁপড়ারাও মাটির নিচে থাকতো এবং সেখানেই শিকার করে খেতো।

পিঁপড়ার বর্ণনাঃ

পিঁপড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং নানা ধরনের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে তাদের সংখ্যা দমিত রাখে। পিঁপড়া ব্যাঙ, টিকটিকি এবং পাখিসহ অনেক ধরনের প্রাণীর খাদ্য। এরা কৃষকদের উপকারেও আসতে পারে আবার ক্ষতির কারণও হতে পারে। সব পিঁপড়াই মৌমাছি, বোলতা এবং উইপোকাদের মতো সমাজবদ্ধ জীবন কাটায়। তাই পিঁপড়াদেরও একজন রাণী থাকে, যার থেকে লক্ষাধিক বাচ্চা হয়।

পিঁপড়ার একটি সামাজিক দল বা কলোনিতে কয়েক ডজন থেকে শুরু করে বহু হাজার পর্যন্ত সদস্য থাকতে পারে। তবে কলোনিভেদে এদের সংখ্যার তারতম্য হয়। এদের প্রত্যেকটি কলোনিতে তিন জাতের সদস্যের উপস্থিতি দেখা যায়- যথাঃ রানী, শ্রমিক এবং পুরুষ। এছাড়া, কলোনিতে সাধারণত এক বা একাধিক রানী, বহু স্ত্রী শ্রমিক এবং কতিপয় পুরুষ সদস্য থাকাটাই হচ্ছে এদের নিয়ম।

পিঁপড়েদের প্রায় সব শ্রমিকই বন্ধ্যা স্ত্রী। সাধারণত বসন্তকালে একটি কলোনিতে কতিপয় পুরুষ এবং রানী পিঁপড়া জন্মায়। এরা উভয়েই ডানাবিশিষ্ট এবং একসময় বাসার বাইরে এসে যৌন মিলনের জন্য ঝাঁক বেঁধে উড়াল দেয়। মিলনের পর নতুন রানী ডিম পাড়ার মাধ্যমে পৃথক একটি কলোনির সূচনা করে এবং সারা জীবন এ কলোনিতেই বাস করে। নতুন রানীর প্রথম প্রজন্মের শাবকের প্রায় সবাই হয় স্ত্রী শ্রমিক।

যাদের ওপর বাসা তৈরি থেকে শুরু করে খাদ্য সংগ্রহ, রানীর যত্ন ও তদারক এবং নতুন শাবকদের লালন- পালনের দায়িত্ব পড়ে থাকে। পুরুষ পিঁপড়াদের একমাত্র কাজ নতুন রানীর সঙ্গে যৌন মিলন করা। মিলনের অল্প দিন পরেই এদের মৃত্যু ঘটে। বড় আকারের শ্রমিকেরা সেনা পিঁপড়া নামে পরিচিত। এদের সাধারণত বড় মাথা এবং বড় ম্যান্ডিবল থাকে। তাই শত্রুর আক্রমণ বা ক্ষতির হাত থেকে কলোনিকে রক্ষা করার দায়িত্ব পড়ে এদের উপর।

পিঁপড়ার যোগাযোগঃ

পিঁপড়াদের মধ্যে যোগাযোগ হয় নানাভাবে। যখনই দুটি পিঁপড়ার সাক্ষাৎ ঘটে, তারা নিজেদের অ্যানটিনার সাহায্যে একে অন্যের ঘ্রাণ নেয় অথবা ফেরোমোন (pheromone) নামে এক ধরনের রাসায়নিক সংকেত ব্যবহার করে। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা এরা স্পর্শন ও রাসায়নিক উভয় ধরনের উদ্দীপকই ব্যবহার করে থাকে।

পিঁপড়ার আরও কিছু অজানা তথ্যঃ

পিঁপড়াদের কোনো কান থাকে না। এদের হাঁটু এবং পায়ে আছে বিশেষ এক ধরণের সেনসিং ভাইব্রেসন, যার মাধ্যমে এরা আশেপাশের পরিস্থিতি বুঝতে পারে। পোকামাকড়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় মস্তিষ্কের অধিকারী হলো পিঁপড়া। এছাড়া, এই প্রাণীটি তার শরীরের ওজনের চেয়েও প্রায় ২০ গুণ বেশি ওজন বহন করতে পারে। পিঁপড়ার কান না থাকায় এরা মাটির কম্পন থেকেই শব্দের ব্যাপারটি বুঝে নেয়। এদের লড়াই শুরু হলে তা মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে।

পিঁপড়া সর্বদা একই রেখায় চলতে থাকে এবং চলার পথে প্রতিটি পিঁপড়াই এক ধরণের তরল পদার্থ (ফেরোমন) নির্গত করে। ফলে পিছনে থাকা পিঁপড়াগুলো সামনের পিঁপড়া গুলোকে অনুসরণ করতে পারে। পিঁপড়ার শরীরে কোনো ফুসফুস নেই। তবে দেহে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে, যার মাধ্যমে এদের শরীরের ভিতর ও বাইরে অক্সিজেন চলাচল করে।

curious24world পিঁপড়া 1
পিঁপড়া

পিঁপড়ার শরীরের গঠন এমন যে এটিকে উড়ন্ত উড়োজাহাজ থেকে ফেলে দিলেও সামান্যতম ব্যথা পাবে না। পিঁপড়া কখনই ঘুমায় না এবং এরা পানির তলদেশে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বাঁচতে পারে। এদের পেট দুটো- যার একটিতে তারা নিজের জন্য এবং অপরটিতে অন্যের জন্য খাদ্য জমা রাখে। এমনকি বিশ্বে যত সংখ্যক জনসংখ্যা রয়েছে তাদের ওজন আর সমস্ত পিঁপড়ার ওজন প্রায় সমান হবে, যা বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন।

বাসস্থানঃ

কোন কোন পিঁপড়া মাটির নিচে বাসা বানায়। তবে গ্রীষ্মমন্ডলীয় এলাকার অনেক প্রজাতির পিঁপড়ারা তাদের বাসা গাছে তৈরি করে থাকে। আবার কেউ কেউ বাসা তৈরির উদ্দেশ্যে পাথর বা শিলার তলা, গাছের ফোঁকর, গুড়ির নিচ অথবা এ ধরনের স্থানগুলোকে বেছে নেয়।

খাদ্যাভাসঃ

পিঁপড়াকে সর্বভুক মনে করা হয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সব জাতের পিঁপড়াই সব কিছু খায়। তবে চিনিযুক্ত খাবার, যেমনঃ ফল, ফুলের রস, পচনশীল মৃত প্রাণী, উদ্ভিদভোজী কীটপতঙ্গের দেহ, নিঃসৃত মিষ্টি রস (honey dew) ইত্যাদি এদের পছন্দের খাবার।

পিঁপড়ার গায়ের রংঃ

অধিকাংশ পিঁপড়াই লাল ও কালো রংয়ের হয়ে থাকে। কিন্তু খুঁজলে অনেক স্থানে সবুজ রংয়ের পিঁপড়ারও সন্ধান পাওয়া যায়।

জীবনকালঃ

সাধারণত পিঁপড়ার জীবনকাল ২৮ বছর। তবে রাণী পিঁপড়া ৩০ বছরেরও অধিক সময় পর্যন্ত বাঁচতে পারে। যখন একটি পিঁপড়া মারা যায় তখন তার শরীর থেকে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়। ফলে অন্য পিঁপড়ারা সহজেই মৃত পিঁপড়া সম্পর্কে তথ্য পেয়ে যায়। আবার নির্গত এই রাসায়নিক পদার্থ যদি অন্য পিঁপড়ার শরীরের লাগে তবে সেই পিঁপড়াও মারা যেতে পারে।

curious 1

আরো পড়ুন –

এলিফেন্ট বা হাতি – প্রানী জগৎ
শেয়ার করুন -

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন