আমেরিকা আবিষ্কারের অজানা ইতিহাস

আমেরিকা আবিষ্কারের অজানা ইতিহাস
আমেরিকা আবিষ্কারের অজানা ইতিহাস

মানুষ আবিষ্কারের নেশায় সর্বদাই মত্ত। প্রাচীনকাল থেকেই এই নেশায় মত্ত হয়ে যুগে যুগে মানুষ আবিষ্কার করেছে নানা সভ্যতা।

আদিকাল থেকেই মানুষের আবিষ্কারের নেশা ছিল নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার করা। উৎসুক-কৌতুহলী মন মানুষকে নিয়ে যেত অজানা অচেনা কোন গন্তব্যে। আর সেই স্থানে ঘটতো মানবসভ্যতার বিকাশ। এভাবেই সাজানো-গোছানো আমাদের আজকের মানবসভ্যতা।

তেমনি পঞ্চদশ শতাব্দির গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিলো আমেরিকা আবিষ্কার। আজ আমরা জানতে চলেছি এই রোমাঞ্চকর কাহিনী সম্পর্কেই।

কীভাবে আমেরিকা আবিষ্কার হলো?

বর্তমান পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকার ইতিহাস খুব বেশি পুরানো নয়। প্রায় ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে আমেরিকার প্রকৃত আবিষ্কারক কে এই প্রশ্নে ঐতিহাসিকরা দ্বিধান্বিত।

এক দল বলেন এখানকার আদি অধিবাসীরাই আমেরিকার প্রকৃত আবিষ্কারক। আরেক দল বলেন ইউরোপীয় ভাইকিং নাবিকরা প্রথম আমেরিকায় পা রেখেছিলেন।

এছাড়া গবেষকদের আরও একটি মত হচ্ছে কলোম্বাস নয় বরং মুসলিম অভিযাত্রীরাই আমেরিকা আবিষ্কার করেছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ এরদোয়ান আমেরিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে মুসলমানদের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করলে বিতর্কটি আবারও নতুন করে জেগে ওঠে।

তবে অধিকাংশ গবেষকই স্বীকার করেন যে, কলম্বাস আমেরিকার আবিষ্কারক নন। এবং ঐতিহাসিকরা তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।

সেসব ব্যাখ্যা জানার আগে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে হবে। চলুন জেনে আসি-

আমেরিকা কে আবিষ্কার করেছে?

এর উত্তরে হয়তো আমরা সবাই বলবো ক্রিস্টোফার কলম্বাস। কিন্তু সত্যিই কি কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিল?

এর উত্তর যতটা সহজ মনে হচ্ছে আসলে তা ততোটা সহজ নয়।

কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার নিয়ে গবেষকদের যথেষ্ঠ আপত্তি রয়েছে। কারণ তারও কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী আমেরিকায় বসবাস করছিল।

এছাড়া কলম্বাসেরও আগে ইউরোপের ভাইকিং ও মুসলিম বণিকদের আমেরিকায় যাওয়ার প্রমাণ রয়েছে।

কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট:

প্রাচীনকাল থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এশিয়ার বিশেষ করে ভারত ও চীনের সম্পর্ক ছিল। চীন থেকে সিল্ক, আফিম ও চীনা মাটির তৈজসপত্র এবং ভারত থেকে মসলা সুতি কাপড় এবং সোনা-রূপার গহনা ইউরোপে আমদানি করা হতো।

এই বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো মূলত সিল্করুট ব্যবহার করে। সিল্করুট ব্যবহারের কারণে এই ব্যবসার বেশিরভাগই ছিল  মঙ্গোল, তুর্কি ও আরব বণিকদের দখলে।

এর ফলে ইউরোপীয়রা তাদের কাছ থেকে বেশ চড়া দামে এইসব পণ্য সামগ্রী কিনতে বাধ্য হতো। সেজন্যেই ইউরোপীয়রা ভারতবর্ষে যাওয়ার জন্য জলপথ আবিষ্কারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠে।

পর্তুগীজ ও স্প্যানিশ নাবিকরা ভারতবর্ষে আসার জলপথ আবিষ্কারের চেষ্টা করে বার বার ব্যর্থ হতে থাকে। তখন ইতালিয়ান নাবিক কলোম্বাস ভারতে যাবার জলপথ আবিষ্কারের প্রত্যয়ে স্পেনের রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রাণী ইসাবেলার শরণাপন্ন হন।

প্রায় বছরখানেক সময় ধরে কলম্বাস তার পরিকল্পনা স্পেনের রাজা-রাণীকে বোঝানোর পর এক পর্যায়ে রাণী ইসাবেলা সেই অভিযানের ব্যয়ভার বহন করতে রাজি হয়।

কলম্বাসের অভিযানের পরিকল্পনা ততোটা বাস্তবসম্মত না হলেও তৎকালীন সময়ের মসলা ও আফিম বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ পাবার জন্য কলম্বাসকে স্প্যানিশরা সহায়তা করে।

সেই অভিযানেই কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছে বলে প্রচার করা হয়।

সেই অর্থে বলা যায়, আমেরিকা আবিষ্কার হয়েছে ভারতবর্ষের জলপথ আবিষ্কার করতে গিয়ে।

ক্রিস্টোফার কলম্বাস।
ক্রিস্টোফার কলম্বাস।

আমেরিকা আবিষ্কারের কোন ইচ্ছা কলম্বাসের ছিলই না। কারণ তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশের কোন অস্তিত্বই ছিল না।

তখন মনে করা হতো ইউরোপ থেকে এশিয়া যাওয়ার পথে পড়বে বিশাল এক সমুদ্র। আর এত দীর্ঘ পথের রশদ নিয়ে যাত্রা করার মতো জাহাজ তখন ছিল না।

সেজন্যই দীর্ঘদিন যাবৎ ইউরোপীয়রা ভারতে আসতে চাইলেও সম্ভব হচ্ছিল না।

১৪৯২ সালের ৩ আগস্ট কলম্বাস ৩টি জাহাজ ও ৯০ জন নাবিক নিয়ে অভিযান শুরু করে। তার মাত্র ২ মাস পর ১২ই অক্টোবর কলম্বাস বাহামা দ্বীপপুঞ্চের কোন এক দ্বীপে অবতরণ করে।

সেখানে নেমেই কলম্বাস মনে করে সে ইন্ডিয়া চলে এসেছে। তাই কলম্বাস সেই দ্বীপে বসবাসরত আদিবাসীদের নাম দেয় ইন্ডিয়ান।

প্রকৃতপক্ষে সেসময় আড়াই লক্ষ টাইনো আদিবাসী সেসব দ্বীপে বসবাস করত। টাইনো জনগোষ্ঠী কলম্বাস ও তার নাবিকদেরকে অতিথী হিসেবে সাদরে বরণ করে।

কিন্তু কলম্বাস সাথে সাথেই স্পেনে ফিরে গিয়ে ১৭টি জাহাজে করে প্রায় ১২০০ লোক নিয়ে আবারো টাইনোদের দ্বীপে হাজির হয়।

তার উদ্দেশ্য ছিল দ্বীপের অধিবাসীদের দাস হিসেবে বন্দী করে তাদের স্বর্ণ লুট করা।

কিন্তু স্বর্ণ কি জিনিস টাইনোরা তা জানতই না।

কোন ধন-সম্পদ না পেয়ে হতাশ হয়ে এক পর্যায়ে কলম্বাসের বাহিনী আশেপাশের সকল দ্বীপের অধিবাসীদের হত্যা করতে শুরু করে। অত্যাচার-নিপীড়ন আর রোগে ভুগে দ্বীপগুলোর ৯০ শতাংশ মানুষ মারা যায়।

সেসময় কলম্বাস যেসকল জায়গায় পৌছেছিল বর্তমানে সেসব দেশগুলো হলো- কিউবার, হাইতি ও ডমিনিকান রিপাবলিক। যেগুলোর একটিও আমেরিকা নয়।

কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কলম্বাস বিশ্বাস করতো যে সে ইন্ডিয়া আবিষ্কার করেছে।

কলম্বাস যেভাবে জনপ্রিয়তা পেল:

১৮২৮ সালে আমেরিকান গল্পকার ওয়াশিংটন আরির্ভিং কলম্বাসের জীবনী নিয়ে একটি বই রচনা করেন। সে বইটিকে সকলের কছে গ্রহণযোগ্য করে তুলার জন্য বইয়ে তিনি কলম্বাসের নামে অতিরঞ্জিত কাহিনী লিখেন। তার অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা ও বোকামীকে লুকিয়ে তিনি কলম্বাসকে এক প্রকার মহান ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেন।

তিনিই তার বইতে প্রথম লিখেন যে কলম্বাসই আমেরিকার আবিষ্কারক।

১৯ শতকের পুরোটা সময় জুড়ে আরর্ভিং এর সেই মনগড়া কাহিনী জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

কলম্বাসের আমেরিকা মহাদেশে অবতরণ
কলম্বাসের আমেরিকা মহাদেশে অবতরণ

আর স্পেনীয়দের বিশ্বাস একজন স্পেনের নাগরিক আমেরিকা আবিষ্কার করেছে, এ কথা তারা চারদিকে প্রচুর প্রচার করতে শুরু করে।

এই প্রচারণা এতোটা বিস্তৃতি পায় যে ১৮৬৬ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকায় ‘কলম্বাস ডে’ উদযাপন শুরু হয়ে যায়।

এখনো পর্যন্ত আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সোমবার কলম্বাস দিবস পালিত হয়। ইতালিয়ান আমেরিকানরা এই দিবসটিকে বিশেষভাবে পালন করে।

অন্যদিকে বাস্তবে কলম্বাসের নিষ্ঠুরতা ও বিতর্কিত ইতিহাসের কারণে বর্তমানে আমেরিকার বহু শহর এবং বেশকিছু রাজ্য এই দিনটিকে কলম্বাস ডে’র পরিবর্তে ‘আদিবাসী দিবস’ হিসেবে পালন করে।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতামত:

সাম্প্রতিক সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা আদিবাসী আমেরিকানরা আজ থেকে প্রায় দেড় লক্ষ বছর আগে এই মহাদেশে পদার্পণ করেছিল। এই অধিবাসীরাই বর্তমান আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।

আরেক দল গবেষকদের মতে আনুমানিক ১২ হাজার বছর পূর্বে আমেরিকান আদিবাসীরা মূলত রাশিয়া ও আলাস্কা হয়ে উত্তর আমেরিকাতে প্রবেশ করেছিল।

১৯৭০ সালের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা আমেরিকার নিউ মেক্সিকোতে ক্লোভিস উপজাতির সন্ধান পায়। এই উপজাতিদের ডিএনএ থেকে প্রায় ১১ হাজার বছর আগে আলাস্কা ও সাইবেরিয়া থেকে আসা আদিবাসীদের যোগসূত্র পাওয়া যায়।

ক্লোভিস গোষ্ঠীকেই আদি আমেরিকানদের উত্তরসূরি বলে ধারণা করা হয়। এই যোগসূত্র থেকেই একদল ইতিহাসবিদ আমেরিকার আবিষ্কারক হিসেবে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে দাবি উত্থাপন করে।

ব্রিটেনের বার্মিংহাম ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক বলেন, কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের প্রায় পাঁচশত বছর আগেই ভাইকিং জাতি আমেরিকা আবিষ্কার করেছিল। ভাইকিংরাই প্রথমবারের মতো আটলান্টিক মহাসাগর পারি দিয়ে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব উপকূল হয়ে গ্রীনল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেন।

১৪ শতকের ভ্রমণ বিষয়ক গ্রন্থ ‘দ্যা সাগা অব গ্রীনল্যান্ডারস’এ বলা হয়েছে ভাইকিং জাতি গ্রীনল্যান্ড থেকে নরওয়ে যাবার পথে ৯৮৬ সালে প্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করে।

আরেক দল গবেষক মনে করেন, কলম্বাস বা ভাইকিংদের আগেই মুসলিমরা আমেরিকায় পৌছেছিলেন। আবু রাইহান নামে এক উজবেক নাগরিক আমেরিকা আবিষ্কার করেন বলে অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা।

আরো পড়ুন:
বিদ্যুৎ শক্তি আবিস্কার – ইতিহাসের সাক্ষী 
বিশ্ব মানচিত্র সৃষ্টির ইতিহাস 
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সৃষ্টির ইতিহাস

কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের সময় ‍কিউবা উপকূলের একটি পাহাড়ে একটি মসজিদের উপস্থিতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। যার কারণে ঐতিহাসিকদের এমন ধারণার উদ্ভব হয়।

এছাড়াও বিভিন্ন ইতিহাসবিদের তথ্যসূত্রে জানা যায়, স্পেনের বিভিন্ন মুসলমান শাসকদের সাথে ৮০০-১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় আমেরিকান আদি অধিবাসীদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।

কলম্বাস ভারত কিংবা আমেরিকা কোনটিই আবিষ্কার করতে না পারলেও সে তৎকালীন ইউরোপীয়দের এক অজানা ভূখন্ডে পৌছেছিল।

তখন কলম্বাস ইউরোপের বাহামা দ্বীপপুঞ্জের যে জায়গায় অবতরণ করেছিল সে জায়গাটির নামকরণ করে সান সালভাদর দ্বীপ। যেটি বর্তমানে ক্যারিবিয়া অঞ্চলের অন্তর্গত।

এমনই নানা মুনির নানা মত রয়েছে আমেরিকা আবিষ্কারের ইতিহাস সম্পর্কে। তবে সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে এখনো কলম্বাসকেই আমেরিকার আবিষ্কারক হিসেবে ধরা হয়।

কিউরিয়াস ইউটিউব চ্যানেল

শেয়ার করুন -

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন