ইতিহাসের সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী – থেলিস

ইতিহাসের সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী - থেলিস
ইতিহাসের সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী - থেলিস

আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে কারও কোনো ধারণা ছিল না। শুধুমাত্র একজন গ্রিক পণ্ডিত আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ব্যাপারটি।

পরে তিনি এর ব্যাখ্যা করেন- আকাশের চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝবরাবর এসে পড়ে, তখন পৃথিবীর কোনো কোনো জায়গা থেকে সূর্যকে দেখা যায় না।

এই ঘটনার পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল সেই পণ্ডিতের নাম। কে সেই পণ্ডিত? তার নাম হচ্ছে থেলিস।

এই ঘটনা নিয়ে আছে এক রোমঞ্চকর ইতিহাস। চলুন আগে জেনে নিই সেই ইতিহাসটি।

তখন খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৫ সাল।। গ্রিক পণ্ডিত থেলিস ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে, ২৮ মে সূর্য দেখা যাবে না। কিন্তু কেউ তাঁর কথা বিশ্বাস করল না।

উল্টো সবাই তাঁকে পাগল ভাবতে শুরু করলো। কিন্তু পণ্ডিত কারোও কথা কানে না তুলে ২৮ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। অবশেষে পণ্ডিতের কথাই সত্য প্রমাণিত হলো।

ঠিকই ২৮ মে সূর্য দেখা যায় নি। সকল গ্রীকবাসী অবাক হয়ে সেই ঘটনা দেখল। অনেকে ভীষণ ভয়ও পেল।

একই সময় ঘটল এক মজার ঘটনা। সেসময় ৬ বছর ধরে লিডিয়ার রাজা অ্যালিয়াটিস এবং মিডিয়ার রাজা সিয়াক্সেরিসের মধ্যে চলছিল তুমুল যুদ্ধ।

সূর্য উধাও হয়ে যাওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে গেল তাদের সেই যুদ্ধ। ভীষণ ভয় পেলেন দুই রাজা। তারা মনে করলেন- তাঁদের বিবাদ ও পাপের জন্যই হয়তো এমন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। অপদেবতারা হয়তো সূর্যকে খেয়ে ফেলেছেন।

সাথে সাথেই দুই পক্ষ শত্রুতা ভুলে বন্ধুত্ব করল।

এরপরই গ্রিক বিজ্ঞানী থেলিস ব্যাখ্যা দেন আসলে সেদিন ঠিক কি ঘটেছিলো।

নাম:

তাঁর নাম থেলিস। তবে মিলেটাসের থেলিস নামেও পরিচিত এই বিজ্ঞানী।

মিলেটাস নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁর নাম হয়ে গিয়েছে মিলেটাসের থেলিস।

তৎকালীন সময়ে তিনি মিলেটাসের সেরা ৭ জন জ্ঞানীর মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন। এবং এখনো পর্যন্ত তাঁকে মনে করা হয় ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী।

থেলিসের জীবনবৃত্তান্ত:

প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাতি পেলেও থেলিসের জীবন সম্পর্কে ইতিহাস থেকে তেমন কিছুই জানা যায়নি।

তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তা হচ্ছে অ্যারিস্টটল, হেরোডোটাস এবং তাঁদের সমসাময়িক লেখকদের লিখা বিভিন্ন বই থেকে।

জন্মগ্রহণ এবং জন্মস্থান:

আনুমানিক ৬২৪ বা ৬২৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে থেলিস জন্মগ্রহণ করেছেন। তবে এই জন্মসাল নিয়েও রয়েছে দ্বিমত।

অনেকের ধারণা, এই বিজ্ঞানী  ৬৩৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিলেটাস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। যে শহরকে বর্তমানে আমরা তুরস্ক বলে জানি। আজ থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ বছর আগে তুরস্কের নাম ছিল মিলেটাস।

আর সে সময় মিলেটাস শহর ছিল গ্রিকদের ভূখণ্ড।

তবে অনেকে মনে করেন, থেলিসের পূর্বপুরুষের আদি নিবাস ছিল ফিনিশিয়াতে। সেখান থেকে তারা মিলেটাস শহরে এসে বসবাস করতে শুরু করেন।

পরিবার:

থেলিসের বাবার নাম এক্সেমায়েস। তিনি একজন সৎ ব্যবসায়ী ছিলেন।

তাঁর মার নাম ক্লেবুলাইন। ঘরের কাজ সামলাতেন।

কর্মজীবন:

জীবনের প্রথম দিকে তিনিও বাবার মতো একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার কারণে বিভিন্ন সময় তিনি বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতেন।

এবং বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন শিক্ষা অর্জন করতেন। এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনের জনক।

এরকমই একবার তিনি ব্যবসার কাজে মিসরে গিয়েছিলেন। মিসরে ভ্রমণের সময় তিনি সেখানকার এক পুরোহিতদের কাছ থেকে জ্যামিতি শেখেন।

তিনিই প্রথম মিসর থেকে শিখে আসা সেই জ্যামিতি গ্রিসে নিয়ে আসেন।

থেলিসের বিজ্ঞানী হয়ে ওঠা এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ:

মিসর থেকে ফিরে এসে অল্পকালের মধ্যেই তিনি ব্যবসা থেকে অবসর নেন।

কিন্তু অবসর নিয়ে তিনি বসে থাকেননি। ব্যবসা ছেড়ে অবসর সময়ে থেলিস জ্যামিতি নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ করতেন।

থেলিস ছোটবেলা থেকেই গণিত ও জ্যামিতির জন্যই বেশি প্রশংসিত।

মিসরীয়দের জ্যামিতির ধারণার জনক বলা হলেও তারা যে ধারণা দিয়েছিল, তা ছিল শুধু তলসংক্রান্ত। কিন্তু এই বিজ্ঞানী এর আরও অনেক উন্নতি করে দেখান। যেমন- ত্রিভুজের ভূমি এবং ভূমিসংলগ্ন দুটি কোণ দেওয়া থাকলে একটি ত্রিভুজ আঁকা সম্ভব।

গ্রিক দার্শনিক হেরোডোটাসের মতানুসারে, থেলিস দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর নিজের ছায়ার দৈর্ঘ্য এবং পিরামিডের ছায়ার দৈর্ঘ্যের অনুপাত নির্ণয় করে সেই পিরামিডের উচ্চতা পরিমাপ করেছিলেন।

এখানেই শেষ নয়, তিনি নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সমুদ্রে অবস্থানরত দূরবর্তী বিভিন্ন জাহাজের দূরত্ব নির্ণয় করার কৌশলও আবিষ্কার করেছিলেন।

এছাড়া প্রকৃতপক্ষে তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন যে, ৩৬৫ দিনে ১ বছর।

সূর্যগ্রহণ সম্পর্কেও তিনি অবগত ছিলেন। এই ব্যাপারে প্রথমেই বলা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, থেলিস কিছু যুগান্তকারী উপপাদ্যেরও জনক। এই যেমন- একটি বৃত্ত তার যেকোনো ব্যাস দ্বারা সমদ্বিখণ্ডিত হয়। কিংবা সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের সমান সমান বাহুগুলোর বিপরীত কোণগুলোও পরস্পর সমান। অথবা অর্ধবৃত্তস্থ কোণের পরিমাণ সবসময় ১ সমকোণ ইত্যাদির মতো আরও বিভিন্ন উপপাদ্য।

যদিও এসব জ্যামিতিগুলো খুব সরল, কিন্তু প্রতিটিই যুগান্তকারী।

থেলিস তাঁর পূর্বপুরুষদের মতো রূপকথার গল্পের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন নি। তিনিই সর্বপ্রথম সবকিছুর মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়ম খোঁজার চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

সমগ্র পৃথিবীর মানুষদের তিনি জানিয়েছেন হাজারো নতুন নতুন তথ্য।

তিনিই প্রথম পৌরাণিক কাহিনির বিশ্বাস থেকে সরে এসে প্রাকৃতিক বিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করেছেন।

মূলত থেলিসই প্রথম গবেষণামূলক বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছিলেন।

মহান এই পণ্ডিতের নিজের লিখিত কোনো পাণ্ডুলিপি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন তথ্য এবং উৎস অনুসারে থেলিসই প্রথম প্রাকৃতিক বিশ্বের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক ‍উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তাঁর জীবদ্দশায় তখন মিলেটাসের মানুষ কুসংস্কারে লিপ্ত ছিল। তারা বিভিন্ন দেবতাদের ভয় পেত। এবং তারা মনে করত যে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসলে মানুষেরই কুকর্মের ফল।

দেবতারা যখন মানুষের কাজে সন্তুষ্ট হয় না, তখই ঝড়, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা কালবৈশাখীর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর আবির্ভাব হয়।

কিন্তু থেলিসই একমাত্র যিনি তখনকার সময়েও এই কুসংস্কারে বিশ্বাসী ছিলেন না।

তিনি যেকোনো রকম প্রাকৃতিক ঘটনার মধ্যে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস না খুঁজে যুক্তি তা দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতেন।

তাই তিনি এটা বিশ্বাস করতেন যে, ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা বন্যার মতো প্রাকৃতিক ঘটনার সঠিক পর্যবেক্ষণ করতে পারলে এগুলো ঘটার পেছনে আসল কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে।

তিনি আরও বিশ্বাস করতেন, কোনো সমস্যার কেন ঘটলো তা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেলে তার পূর্বাভাসও পাওয়া সম্ভব।

উপরন্তু তাঁর এই যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার দৃষ্টিভঙ্গি মানবসভ্যতায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। সূচনা হয়েছে নতুন এক দিগন্তের।

তবে গুণী এই পণ্ডিত নাস্তিক ছিলেন না, এটাও তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সবকিছু সৃষ্টির পেছনে ঈশ্বর বা দেবতাদের অবশ্যই হাত রয়েছে।

তাঁর বিখ্যাত বিভিন্ন উক্তির মধ্যে একটি হলো, সবকিছু ঈশ্বরে পরিপূর্ণ।

কিন্তু শুধুমাত্র গণিত নিয়ে ভাবলে কিংবা উপপাদ্য সৃষ্টি করলেই তো আর ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী হওয়া যাবে না। বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয় নিয়েও কাজ করতে হবে।

তাও করেছিলেন থেলিস। মহাবিশ্বের প্রকৃতি নিয়েও ভেবেছিলেন তিনি। এমনকি সব সময় মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহে তিনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতেন।

নিজে নিজে ভাবতেন, মহাবিশ্ব কী দিয়ে গঠিত?

তবে তাঁর এই ভাবনা শুধুমাত্র ভাবনাতেই থেমে থাকেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্বের সবকিছুই কোন না কোন মৌলিক উপাদান দিয়ে গঠিত। আর সেই মৌলিক উপাদানটি হচ্ছে পানি।

আরো পড়ুন:
আমরন বেঁচে থাকার জন্য বিজ্ঞানীদের কিছু গবেষণা 
বিদ্যুৎ আবিষ্কার এবং এর আধুনিকায়নের ইতিহাস 
বিজ্ঞানের যুগান্তকারী উদ্ভাবন বদলে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ দুনিয়া

পানিই একমাত্র উপাদান, যেটি দিয়ে মহাবিশ্বের সকল কিছুর উৎপত্তি হয়েছে।

এর পেছনেও তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, মহাবিশ্ব সৃষ্টির মৌলিক উপাদান পানি ছাড়া অন্য কোন কিছুই হতে পারে না। কেননা একমাত্র পানি দিয়েই সবকিছু করা যায়। আমাদের জীবনেও সবচেয়ে বেশি দরকারি উপাদান হচ্ছে পানি।

তাছাড়া পানি কঠিন, তরল কিংবা বায়বীয়—সব ধরণের অবস্থাতেই থাকতে পারে।

সুতরাং মহাবিশ্ব তৈরির মৌলিক উপাদান পানি ছাড়া আর ‍অন্য কিছু হতেই পারে না।

শুধুমাত্র এই জায়গাটেতেই ভুলটা করেছিলেন থেলিস। অবশ্য আমরা এখন জানি, পানি মৌলিক উপাদান নয়।

থেলিসের আরও একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, সবকিছুর আদিমতম উপাদান পানি।

বিখ্যাত এই বিজ্ঞানী শুধু মহাবিশ্ব তৈরির উপাদান নিয়েই পড়ে ছিলেন না। এমনকি মহাবিশ্বের কোথায় পৃথিবীর অবস্থান, সে ব্যাপারেও তিনি বর্ণনা করেছেন।

তাঁর ধারণা ছিল, যেহেতু মহাবিশ্ব পানির সৃষ্ট, তাই পৃথিবী হয়তো পানির ওপরে সমতলভাবে ভাসমান। এবং তিনি সেই সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাস করতেন।

ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী থেলিস মৃত্যুর আগমুহূর্তেও মিসরের পুরোহিতদের প্রতি ঋণ ভোলেননি।

মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর ছাত্র পিথাগোরাসকে মিসরে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন। পিথাগোরাসও শিক্ষাগুরুর কথামতো মিসরে গিয়েছিলেন। মিসরের পুরোহিতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনিও বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

মৃত্যু:

৫৪৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ৭৮ বছর বয়সে ইতিহাসের এই আদি বিজ্ঞানী থেলিস মৃত্যুবরণ করেন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

শেয়ার করুন -

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন