কীভাবে চলছে তালেবানের দখল করে নেওয়া শহরগুলো?

কীভাবে চলছে তালেবানের দখল করে নেওয়া শহরগুলো?
কীভাবে চলছে তালেবানের দখল করে নেওয়া শহরগুলো?

বিদ্যুত গতিতে এগুচ্ছে তালেবান। একের পর এক দখল করে নিচ্ছে আফগানিস্তানের বিভিন্ন জায়গা। যুদ্ধের সমুখে পড়ে কীভাবে চলছে তালেবানের দখল করে নেওয়া শহরগুলো?

যুদ্ধের পর পরই তালেবানের দখল করে নেওয়া শহরগুলোয় বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে নারী ও পুরুষ কর্মীদের বৈঠক। এছাড়াও আরও নানা রকম বিধি-নিষেধের বেড়াজালে বেধে রেখেছে এসব শহরের সাধারণ জনগণদের।

এসব কারণে সম্প্রতি সেখানকার মানুষদের কাজের ধরন অনেকখানিই বদলে গেছে।

কোন কোন এলাকা দখল হয়েছে?

হিন্দুকুশ মাউন্টেন রেঞ্জে অবস্থিত ইশকামিশ অঞ্চল। এটি আফগানিস্তানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্ত এলাকা। কয়েক মাস আগেও এখানে নেটোর প্রায় ১০ হাজার সৈন্য মোতায়েন ছিল। আজ তা তালেবানের দখলে।

মে মাসের আরম্ভের দিকে সেখান থেকে বিদেশি সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এরপর থেকেই তালেবান ইশকামিশ গ্রামীণ এলাকাটি দখল করে নেওয়ার ব্যাপারে সাহসী হয়ে ওঠে। এবং এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ এলাকাটিই দখল করে নেয়।

হেলমান্দ প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলের আফগান সরকারি বাহিনীর সদস্যরা এসময় অনেকটাই অপ্রস্তুত ছিল।

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে তাদের সঙ্গে তালেবানের শুরু হয়ে যায় তীব্র লড়াই।

প্রথমে সরকারি সৈন্যদের পরাজিত করে তারপর তালেবান যোদ্ধারা দখল করে নেয় পাহাড়ের পাদদেশে থাকা বুরকা এলাকা।

প্রায় একই সময়ে কান্দাহার বিমান ঘাঁটি ত্যাগ করে চলে যায় মার্কিন সৈন্যরা।

দাবি করেছে তারা পুরো জুন মাস জুড়ে উত্তরের আরো কয়েকটি প্রদেশ দখল করে নেবে। এসব প্রদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে তাখার, ফারিয়াব এবং বাদাখশান।

এই প্রদেশগুলো থেকে সরকারি বাহিনীর সৈন্যদের জায়গা ছেড়ে যেতে বাধ্য করে তালেবান।

তাদের অত্যাচরে এর মধ্যে আড়াই হাজার মার্কিন সৈন্যদের অধিকাংশই আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যায়। অল্প কিছু সংখ্যক সৈন্য এখনও রাজধানী কাবুলে রয়ে গেছে।

আফগানিস্তানের বৃহত্তম বিমানঘাঁটি বাগরাম থেকে মার্কিন এবং নেটোর সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার ঠিক ২ দিন পর, ৪ঠা জুলাই- তালেবান আফগানের কান্দাহার প্রদেশের পাঞ্জোয়া জেলা দখল করে নেয়।

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বাহিনীর অভিযানের ক্ষেত্রে বাগরাম বিমানঘাঁটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

মাসের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যেই তালেবানরা দাবি করে যে তারা আফগানিস্তান সীমান্তের ৯০% এবং দেশের ৮০% এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।

যদিও এই দাবির ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে আফগান সরকার। তবে কোন পক্ষের দাবি যে সঠিক তা যাচাই করা কঠিন।

এছাড়াও আফগানিস্তানের আরও অনেক অঞ্চল এখন তালেবানের দখলে।

ভীত সন্ত্রস্ত শহরের বাসিন্দারা

কান্দাহার হলো আফগানিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এই শহরের বাসিন্দারা তালেবানের অগ্রগতির ব্যাপারে খুব ভালোভাবেই অবগত ছিলেন।

কান্দাহার শহর থেকে অদূরে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী আরঘিস্তান জেলার জনৈক একজন বাসিন্দা বলেছেন, “এখানকার প্রত্যেকটি মানুষ প্রবল ভয়ে ভীত হয়ে আছে।”

মানুষজন ঘরের বাইরে বের হয় না। এ সময় তারা নিজেদের নিজেরাই একরকম ঘরেই বন্দী করে রেখেছিল।

তালেবান প্রায় প্রতিটি গ্রামেই অবস্থান নেয়। এবং তাদের কবল থেকে কারো পালানোরও উপায় ছিল না।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে হানা দেয় তালেবান

তালেবানের সশস্ত্র যোদ্ধা বাহিনীরা রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়। সাধারণ মানুষদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজায় টোকা দেয় সকাল-সন্ধ্যা।

তাদের উদ্দেশ্য নিজেদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করা।

গ্রামবাসীরা তাদের খারাপ পরিণতির কথা চিন্তা করে না চাইতেও সেসব যোদ্ধাদের হাতে খাবার-দাবার তুলে দেয়।

এমনকি যোদ্ধারা যদি এসব লোকজনের বাড়িতে থাকতে চায়, তাহলেও তাদেরকে সেই অনুমতি দিতে বাধ্য হয় বাসিন্দরা।

সামাজিক বিধি-নিষেধ আরোপ:

এই প্রথমবারের মতো আফগানী নারীদের ওপর নানা ধরনের বিধি-নিষেধ নেমে এলো।

যেমন- বাড়ির বাইরে গেলে তাদের বোরকা পরতে হয়। এছাড়াও এসময় তাদের সাথে একজন পুরুষও থাকতে হয়ে।

যেকারেণে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নারীদের পুরো এলাকায় সাধারণভাবে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এমনকি নারীদের লেখাপড়াও বন্ধ।

পুরুষদের ক্ষেত্রে দাড়ি কামানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তালেবান বলছে দাড়ি কামানো নাকি ইসলামবিরোধী।

এমনকি বিদেশিদের মতোন মাথার পেছনে এবং কানের দুপাশে ছোট করে চুল কাটার স্টাইলও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তালেবান বাহিনীর ভেতরে ‘আমরি বিল মারোফ’ নামক একটি গ্রুপ এসকল বিভিন্ন সামাজিক নিয়ম বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। ‘আমরি বিল মারোফ’ এর আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ‘আল্লাহর নির্দেশ।’

দীর্ঘকাল ধরে চলা এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ
দীর্ঘকাল ধরে চলা এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ

১৯৯০-এর দশকে আফগানিস্তানে অপরাধীদের যেসকল ভয়াবহ শাস্তি প্রদান করা হতো- তথাকথিত এই গ্রুপটি সেই ভীতিকর পরিস্থিতি আবার ফিরিয়ে এনেছে।

গ্রুপটি এখন আবার ২ স্তরবিশিষ্ট শাস্তির প্রচলন শুরু করেছে- প্রথমে অপরাধীদের সতর্ক করে দেওয়া হয় এবং তারপরে শাস্তি দেওয়া হয়।

যেসব শাস্তির মধ্যে থাকছে প্রকাশ্যে অবমাননা, প্রহার, কারাদণ্ড, চাবুক মারা, বেত্রাঘাত ইত্যাদি।

এসবের পাশাপাশি অপরাধ-জনিত বিভিন্ন কর্মকান্ডের ব্যাপারে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। যদিও স্থানীয় লোকজন এই পরিবর্তনের ব্যাপারে খুশি, কিন্তু তারা এই অবস্থা কতদিন স্থায়ী থাকবে সেবিষয়ে নিশ্চিত নন।

তালেবানের দখল করে নেওয়া শহরগুলোয় উপার্জন বন্ধ

নিষেধাজ্ঞার ফলে শহরগুলোয় আরো অনেক জিনিসও বন্ধ হয়ে গেছে।

অন্যান্য স্থানের আফগানরা তাখার প্রদেশে বেড়াতে আসতেন।

আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের ভেতর তাখার খুবই বিখ্যাত। এই প্রদেশে রয়েছে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বিস্তৃত শ্যামলিমা, সবুজ গাছপালা, বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ পানির নদী, পাহাড়ি নির্মল বাতাস এবং তুষারে আবৃত পর্বতমালা দেখতে অনেকেই বেড়াতে আসতেন এই প্রদেশে।

কিন্তু তালেবানের এই অগ্রযাত্রার কারণে পর্যটকদের বেড়াতে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে।

যেকারণে সেখানকার ড্রাইভার, ট্রাভেল এজেন্সিসহ এই সংশ্লিষ্ট সকলের জীবিকা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

এর পাশাপাশি সামাজিক জীবনেও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।

আগে যেখানে শুক্রবার রাতে পার্টি করা হতো, গান বাজনা নাচ হতো, মজা করা হতো- এখন সেসব কিছু নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ

যুদ্ধ ও দখলদারির ফলে সব ধরণের ব্যবসা বাণিজ্যেই একই ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

কান্দাহার প্রদেশের পাঞ্জোয়া জেলা দখলের ১ সপ্তাহেরও কম সময়ে তালেবানের পক্ষ হতে দাবি করা হয় যে তারা ইরানের সাথে দেশটির সবচেয়ে বড় সীমান্ত চৌকি ও বাণিজ্য পথে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এবং তারা আরও দখল করে নিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর – ইসলাম কালা।

তালেবান বাহিনী যতোই তাদের নিয়ন্ত্রণকে পোক্ত করার চেষ্টা করতে থাকে, ঘরের ভেতর লুকিয়ে থাকা মানুষজন ততই বাইরে বের হতে শুরু করে।

তালেবান কোনো একটি অপরাধমূলক ঘটনার দ্রুত বিচার করে। যেসব প্রক্রিয়ায় তারা সবকিছু পরিচালনা করে আফগানের অনেকেই সেসব আগে কখনো দেখেনি।

আরো পড়ুন:
দশকের পর দশক ধরে আফগানিস্তানে যুদ্ধ কেন চলছে?
তালেবানের অগ্রযাত্রা রুখতে রাতে কারফিউ জারি করেছে আফগানিস্তান 

আফগানী বিভিন্ন স্থানের বাসিন্দারা জানায় সেখানে দ্রব্যমূল্য প্রচুর বৃদ্ধি হয়েছে। এর পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে আর্থিক চাপ। সব জিনিস-পত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া।

এছাড়াও বাইরের কিংবা ভেতর সব ধরনের বাণিজ্যই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংকুচিত হয়ে পড়েছে দেশটির অর্থনীতি। সরকারি কাজও সব প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

সাধারণ লোকজনের যেমন কাজের কোনো সুযোগ নেই তেমনি নেই কোনো বিনিয়োগও- জানায় স্থানীয়রা।

এখানেই শেষ নয়, তালেবানরা এলাকার সবগুলো স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের কথা হচ্ছে- কঠোর ইসলামিক শরিয়া আইনের বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা অনুসারে বাচ্চাদের সঠিক শিক্ষা দিতে হবে।

তালেবান বাহিনীর অগ্রযাত্রা থেমে নেই

এত কিছুর পরেও তালেবানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। চলতি অগাস্ট মাসেই তারা বেশ কিছু বড় বড় শহরের কেন্দ্র আক্রমণ করেছে। আঞ্চলিক রাজধানীগুলোরও প্রায় ১ তৃতীয়াংশ এখন তাদের দখলে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরের কুন্দুজ এবং তাখার প্রদেশের তালোকান।

আরও দখল করে নিয়েছে পশ্চিমের হেরাত, দক্ষিণের কান্দাহার এবং লশকর গাহসহ অনেক এলাকা। যেখানে দশ লাখেরও বেশি মানুষ বাসবাস করে।

দীর্ঘ দিন ধরে চলা এই যুদ্ধের কবলে পরে বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাড়ি ঘর থেকে পালিয়ে হয়েছে উদ্বাস্তু।

এখন দেশটির মূল নিয়ন্ত্রণ যে কাদের হাতে সেটিও নিশ্চিত নয়। তবে তালেবানের দখল করে নেওয়া শহরগুলো এবং যেসকল জায়গায় এখন তালেবান শাসন করছে, সেসব স্থানে পরিবর্তন স্পষ্ট।

subscribe to our youtube channel 2

শেয়ার করুন -

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন