বাসক গাছ – বাংলার অতি পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ

বাসক গাছ - বাংলার অতি পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ
বাসক গাছ - বাংলার অতি পরিচিত ভেষজ উদ্ভিদ

আমাদের দেশে যতগুলো ভেষজ উদ্ভিদ পাওয়া যায় তাদের মধ্যে বাসক গাছ অন্যতম। গুণাগুণ ও সহজলভ্যতার কারণে অতি প্রাচীন কাল থেকেই ভেষজ ওষুধের দুনিয়ায় বাসকের সমাদর হয়ে আসছে।

এর উপকারিতার কথা বুঝতে পেরে ইদানিং বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তে বাণিজ্যিকভাবে বাসক গাছের চাষ করা আরম্ভ হয়েছে।

আজকে আমরা বাসক গাছ সম্পর্কে নানা জানা-অজানা তথ্য জানবো। এবং আরও জানবো এর মধ্যে কি কি উপকারিতা রয়েছে।

নাম:

বাসক গাছ একেক জায়গায় একেক নামে পরিচিত। বাংলায় একে বাসক বলা হলেও বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন নাম।

হিন্দিতে একে আড়ষা, আঙ্গুলসা ও বাসা নামে ডাকা হয়।

মারাঠি ভাষায় অড়ুপ ও আঙ্গুলিয়া।

তেলেগুতে আড়সে।

সংস্কৃতিতে বাসক।

এছাড়াও এই উদ্ভিদের আরও অনেক নাম রয়েছে। যেমন- ভাসক বাকাস, বাসা আলোক-বিজাব

এর ইংরেজি White Dragon’s Head, Malabar Nut.    

বৈজ্ঞানিক নাম:

বাসক গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Justicia Adhatoda.

পরিবার:

বাসক Acanthaceae পরিবারের অন্তর্গত সপুষ্পক গুল্ম জাতীয় একটি উদ্ভিদ।

প্রজাতি:

বাসক গাছ ২ প্রজাতির পাওয়া যায়।

শ্বেত ও তাম্র এই দুই ধরণের বাসক প্রকৃতিতে দেখা যায়।

প্রাপ্তিস্থান:

বাসক গাছ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঔষধী গুল্ম উদ্ভিদ।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ায় এই গাছের বিস্তৃতি রয়েছে।

বাংলাদেশে বাসক গাছ অতি পরিচিত সাধারণ এক উদ্ভিদ। আকার-আকৃতি:

বাসক গুল্মজাতীয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। ক্ষুপজাতীয় গাছ হওয়া সত্ত্বেও সাধারণত ৫-৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

এটি বাসক গাছের সাধারণ উচ্চতা। তবে অনেক সময় এই গাছ ২০ ফুটও হতে পারে।

গঠন ও বৈশিষ্ট্য:

বাসক ঘন এবং অধিক শাখান্বিত চিরসবুজ গুল্ম। কান্ড কাষ্টল।

  • পাতা:

বাসক গাছের পাতা বর্শার ফলার মতো, সামনের দিকে চোখা, সরল এবং বৃহৎ। প্রতিমুখ, শিরাবিন্যাস জালিকা। পাতা প্রায় ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বড় হয়।

মঞ্জুরি পত্র ও মঞ্জুরি উপপত্র বৃহৎ এবং চোখে পড়ার মতো।

  • ফুল:

বাসক একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ, আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে এর ফুল আসে। ফুলের আকার ৩-৫ সেমি.। ফুলের রঙ সাদা কিংবা নীলাভ সাদা।

পুষ্পদন্ড ১-৩ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়।

  • ফল

বাসক গাছের ফল ছোট ছোট গোল। একসঙ্গে অনেকগুলো হয়ে থাকে।

বাসক গাছে ফুল এবং ফল ধারণ ঘটে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে।

  • বীজ:

বীজের আকৃতি ছোট ছোট। খুবই সূক্ষ্ম লোমে ঢাকা থাকে। বীজকোষে সাধারণত ২-৪টি বীজ থাকে। অর্ধগোলাকার, চাপা এবং অমসৃণ।

যে ২ প্রজাতির বাসক দেখা যায় তাদের মধ্যে শ্বেত বাসকের (সাদা ফুল) আকার সাধারণত লম্বায় খুব বেশি বড় হয় না। এর কান্ড সোজা। শাখা গোলাকার, পাতা লম্বা হয়। ফুলের আগার দিকে বেগুণী রঙের ডোরাকাটা থাকে।

বাসক ফুল
বাসক ফুল

যে বাসক (ফুল) তাম্র বর্ণের সে বাসক গাছের ডাল কিছুটা মোটা হয়। ডাল, পাতা, ফুল এবং ফল সবই লাল রঙের হয়। আমাদের দেশে এই জাতের বাসক গাছ সচরাচর দেখা যায় না।

বাসক গাছের পাতা, ফল, বীজ, ছাল-বাকল সবকিছুই তিতা স্বাদযুক্ত। তবে তাম্র প্রজাতির বাসক গাছে তিতকুটে ভাগটা কম।

কোথায় পাওয়া যায়?

বাংলাদেশের পথে-ঘাটে রাস্তার ধারে এই গাছ প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে থাকে।

তবে বর্তমানে ওষুধ তৈরির জন্য এর চাষ করা শুরু হয়েছে।

এছাড়াও হিমালয়ের পাদদেশ, আসাম ও খাসিয়া পার্বত্য অঞ্চলে এই গাছগুলো বেশি দেখা যায়।

বংশবৃদ্ধি:

আমাদের দেশের লাল ও পাকুড়ে মাটিতে এই গাছ বেশি জন্মে। তাই এই ধরণের মাটি বাসক গাছ লাগানো বা প্রাকৃতিক ভাবে জন্মানোর জন্য উপযুক্ত।

বীজ থেকে এই গাছ প্রাকৃতিকভাবে বংশবিস্তার করে থাকে।

চাষ করতে চাইলে বীজ অথবা কাটিং পদ্ধতিতে ডাল কেটেও এর বংশবৃদ্ধি করা যায়।

আয়ুষ্কাল: 

বাসক গাছ বহুবর্ষজীবি উদ্ভিদ।

পুষ্টিগুণ:

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উদ্ভিদটির পাতায় ভ্যাসিসিন, ভ্যাসিসিনল, ভ্যাসিকোলাইন, ভ্যাসিকোলিনাইন এবং অ্যাডাটোডাইন নামের বেশকিছু এ্যালকো লাইট পাওয়া যায়।

এর পাশাপাশি বাসক পাতায় এবং গাছে এসেনশিয়াল ওয়েলও পাওয়া যায়।

উপকারিতা:

উদ্ভিদটির ওষুধ হিসেবে ব্যবহার্য অংশ হলো পাতা মূল ও বাকল।

ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে এর কদর সেই আদিম যুগ থেকেই। শ্লেষানাশক হিসেবে এর পাতা ব্যপক সমাদৃত।

চলুন জেনে নিই বাসক গাছের কিছু উপকারিতা সম্পর্কে-

  • সর্দি-কাশিতে-

বাসক গাছ সর্দি-কাশির জন্য খুবই উপকারি। এই গাছের ১০টি পাতা ৪ কাপ পানিতে ২০ গ্রাম মিছরি এবং ১০টি গোলমরিজ দিয়ে ফোটাতে হবে। এরপর এই সিদ্ধ পানি সকাল-সন্ধা নিয়মিত ২বার খেতে হবে।

এভাবে সেবন করলে ৩-৪ দিনের মধ্যেই সর্দি-কাশি থেকে সম্পূর্ণ রেহাই পাওয়া যাবে।

  • হাঁপানিতে-

শুকনো বাসকপাতা চুরুটের মতো পাকিয়ে ধীরে ধীরে তার ধোয়া টানলে শ্বাসকষ্ট কিছুটা প্রশমিত হয়।

  • হাত-পা ফুলে গেলে-

শরীরে রক্ত কম হলে হাত, পা ও মুখ ফুলে যায়। ৬-৮ চামচ বাসক পাতার রস দিনে একবার করে খেলে ফুলো কমতে থাকে।

  • ক্ষয়রোগে-

বাসক গাছের ছাল ১০ গ্রাম এবং সমপরিমাণ অর্জুন গাছের ছাল, ৫০০ মিলিলিটার পানিতে সিদ্ধ করে ৫০ মিলিলিটার থাকতে উনুন থেকে নামিয়ে তা দেড় চামচ মধুর সঙ্গে মিশিয়ে নিয়মিত খেলে ক্ষয়রোগ সেরে যায়।

  • চামড়ার রঙ উজ্জ্বল করতে-

১০ মিলিলিটার বাসকপাতার রসে ৪ গ্রাম পরিমাণ শঙ্খভস্ম মিশিয়ে গোসলের ৩ ঘন্টা আগে হাত ও মুখে মাখলে চামড়ার রং বেশ উজ্জ্বল হয়।

  • খাবার পানি জীবাণুমুক্ত করতে-

জীবাণুমুক্ত করতে এই গাছের জুড়ি নেই। এতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে যার কারণে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সহজে এর কাছে আসে না। এবং আসলেও তা ধ্বংস যায়।

আরো পড়ুন:
কালোজিরা গাছ – মহৌষধী গুণ সমৃদ্ধ এক উদ্ভিদ 
বনসাই উদ্ভিদ- জীবন্ত শীল্পকর্ম বলা হয় যেটিকে 
নিম গাছ – নানান উপকারীতায় সমৃদ্ধ এক উদ্ভিদ

১০/১২টি বাসক পাতা ছোট ছোচ টুকরা করে কেটে ৫ লিটার পরিমাণ পানিতে ৩-৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে দিলে পানি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত হয়ে যায়।

প্রচণ্ড গরম এবং বর্ষাকালে এভাবে পানি জীবাণুমুক্ত করে নিলে কলেরা, আন্ত্রিক, টাইফয়েড, আমাশয় ইত্যাদি পানিবাহিত রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

  • অম্ল-পিত্তে-

১০ মিলিলিটার বাসক ফুলের রস ১ চামচ চিনির সঙ্গে মিশিয়ে দিনে একবার খেলে উপকার পাওয়া যায়।

  • রক্তপিত্তে-

১০ মিলিলিটার বাসক পাতার সে দেড় চামচ মধুর সঙ্গে মিশিয়ে সকাল-সন্ধ্যা ২বার করে খেলে ৩/৪ দিনের মধ্যেই আরোগ্য লাভা করা যাবে।

subscribe to our youtube channel 2

শেয়ার করুন -

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন