বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের স্বাধীনতার রূপকার – তাজউদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের স্বাধীনতার রূপকার – তাজউদ্দীন আহমদ
বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের স্বাধীনতার রূপকার – তাজউদ্দীন আহমদ

তৎকালীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম নেতাও ছিলেন তিনি।  

তিনিই ১৯৭১ সালে তৎকালীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন তাজউদ্দীন আহমদ তৎকালীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন যা “মুজিবনগর সরকার” নামে অধিক পরিচিত।

তাজউদ্দীন আহমদ একজন সৎ এবং মেধাবী রাজনীতিবিদ হিসেবে বিশেষ পরিচিত ছিলেন।

জন্মগ্রহণ:

তাজউদ্দীন আহমদ ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুর জেলার অন্তর্গত কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

পরিবার:        

তাঁর পিতার নাম মোঃ ইয়সিন খান পেশায় তিনি ছিলেন মৌলভী। এবং মাতার নাম মেহেরুননেসা খান।

৪ ভাই, ৬ বোনের মাঝে ৪র্থ ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

ব্যাক্তিগত জীবন:

তাজউদ্দীন আহমদের স্ত্রীর নাম সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন; তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডণীর বর্তমান সদস্য।

এই দম্পতির ৪ সন্তান।

বড় মেয়ে শারমিন আহমদ রিতি।

মেজো মেয়ে বিশিষ্ট লেখিকা ও কলামিস্ট সিমিন হোসেন রিমি; একই সাথে তিনি গাজীপুর-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য।

কনিষ্ঠা মেয়ের নাম মাহজাবিন আহমদ মিমি।

এবং পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান তানজিম আহমদ সোহেল তাজ। তিনি গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে আসীব অবস্থায় পদত্যাগ করেন। এবং ২০১২ সালের ৭ জুলাই তাঁর আসন শূণ্য ঘোষণা করা হয়।

শিক্ষা জীবন:

তাজউদ্দীন আহমদ পড়াশোনা শুরু করেন বাবার কাছে আরবি শিক্ষার মাধ্যমে।

একই সময়ে তিনি ১ম শ্রেণীতে ভর্তি হন বাড়ি থেকে ২ কিলোমিটার দূরের ভূলেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷

১ম এবং ২য় শ্রেণীতে সম্মানের সহিত ১ম স্থান অর্জন করেন তিনি৷

তারপর ৪র্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন কাপাসিয়া মাইনর ইংলিশ স্কুলে।

এরপর তিনি একে একে পড়েছেন কালিগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস ইনস্টিটিউশন, মুসলিম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা ও সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে।

উল্লেখ্য, তাজউদ্দীন আহমদ একজন কোরআনে হাফেজ ছিলেন। যে যোগ্যতা তিনি নিয়মিত পড়ালেখার পাশাপাশি বাবার সান্নিধ্যে থেকে রপ্ত করেন।

১৯৪৪ সালে তিনি মেট্রিকুলেশন পাশ করেন।  এবং তারপর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ অর্থ্যাৎ বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবিভক্ত বাংলার সম্মিলিত মেধাতালিকায় যথাক্রমে দ্বাদশ এবং চতুর্থ স্থান (ঢাকা বোর্ড ) লাভ করেন।

১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতি বিষয়ে বি.এ (সম্মান) ডিগ্রী অর্জন করেন।

১৯৬৪ সালে তিনি রাজনৈতিক বন্দী হয়ে পড়েন। তারপরও কারাগারে থাকা অবস্থায়ও তাজউদ্দীন আহমদ এল.এল.বি. ডিগ্রীর জন্য পরীক্ষা দেন এবং সম্মানের সহিত পাস করেন।

রাজনৈতিক জীবন:

  • রাজনৈতিক জীবনে পদার্পণ: ১৯৪৩ সাল থেকে তাজউদ্দীন আহমদ প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। যখন আবুল হাশিম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।  এরপর ১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন।

  • রাজনীতি এবং তাজউদ্দীন:

বাংলাদেশের রাজনীতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ ওতোপ্রতোভাবে জড়িত।

  • তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। যা ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত হয়। তখন এর নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ।

  • এছাড়াও তিনি ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন।

  • আরও ছিলেন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

  • ১৯৫৩-১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

  • ১৯৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হিসেবে মুসলিম লীগের সাধারণ পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ।

  • ১৯৬৪ সালে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ এর সাংগঠনিক সম্পাদক হন এবং

  • ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

  • ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরের সর্বদলীয় নেতৃ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান যে ছয়দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন, সেই সম্মেলনে শেখ মুজিবের সাথে তিনিও অন্যতম সেরা সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

  • একই বছরের ৮ই মে তিনি দেশরক্ষা আইনে তৎকালীন পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হন তাজউদ্দীন।

  • ৬৯’এর গণঅভ্যুত্থান ঘটার ফলশ্রুতিতে তিনি জেল থেকে মুক্ত হন।

  • ১৯৭০ সালে তাজউদ্দীন আহমদ আবারো তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন।

  • একই বছরে তিনি সাধারণ নির্বাচনের জন্য গঠিত আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি বোর্ডের সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হন।

  • এরপর ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচিত হন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাজউদ্দীনের ভূমিকা:

১৯৭১ সালের নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভের পরও পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেয়।

একারণে শেখ মুজিবের ডাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন আরম্ভ হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরীহ বাঙালীদের উপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, যা গণহত্যা হিসেবে আখ্যা পায়। এর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।

এরপর পরই শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। তাজউদ্দীন আহমদের ভাষায়, “আমি সেদিন সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলো- একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা৷”

যুদ্ধের কৌশল হিসেবে প্রথমে আত্মরক্ষা তারপর প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সর্বশেষে পাল্টা আক্রমণ এই নীতিকে পুঁজি করে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য তিনি সরকার গঠনের চিন্তা করতে থাকেন।

একারণে প্রথমে তাজউদ্দীন আহমদ আত্মগোপন করেন। এবং যুদ্ধকে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে সীমান্ত অভিমুখে যাত্রা করেন।  ৩১ মার্চ তিনি ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পদার্পণ করেন।

ভারতে পৌছানোর পর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার ইসলামকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন।

সীমান্তে পৌঁছে তাজউদ্দীন আহমদ দেখলেন যে বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনাদের সমর্থনে ভারত সরকার থেকে আদেশসূচক নির্দেশনা পাওয়ার আগ পর্যন্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছুই করার নেই।

বিষয়টি বিবেচনা করে তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিফৌজ গঠনের ব্যাপারে বিএসএফ এর সাহায্য চান। কিন্তু তাতে তিনি ব্যার্থ হন।

এরপর কেএফ রুস্তামজী দিল্লির ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার ইসলামকে নিয়ে দিল্লি চলে যাওয়ার জন্য।

যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তাজউদ্দিন আহমদের সম্মিলিত বৈঠক।

দিল্লিতে যাবার পর ভারতীয় সরকার বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে, তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠতম একজন সহকর্মী।

তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহকর্মী
তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহকর্মী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পূর্বে ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাজউদ্দিন আহমদের কয়েক দফা বৈঠক হয়ে যায়। এবং তিনি তাদেরকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনা করার জন্য যেসকল সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন তা ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলেন।

এসময় তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে আওয়ামী লীগের একজন নেতা হিসেবে যদি তিনি ভারত সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তবে সামান্য সহানুভূতি আর সমবেদনা ছাড়া তেমন কিছুই আশা করা যায় না।

নতুন সরকার গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারত সরকারের দৃঢ় সমর্থন ব্যতীত বিশ্বের অন্য কোন দেশই বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে না।

এছাড়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসার আগের দিনও এক ঐ সরকারের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চান যে- স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে কোন নতুন সরকার গঠন করা হয়েছে কিনা। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি রূপে নিজেকে উপস্থাপন করবেন।

কারণ তাজউদ্দীনের ধারণা হয় এতে করে ‘পূর্ব বাংলার জনগণের সংগ্রামকে সাহায্য করার জন্য ৩১ মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্টে যে প্রস্তাব গৃহীত হয়’ তা কার্যকর রূপ লাভ করতে পারে।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সূচনাতে তাজউদ্দিন জানান যে পাকিস্তানি আক্রমণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ২৫/২৬ মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে নতুন সরকার গঠন করা হয়েছে।

শেখ মুজিবের গ্রেফতার প্রসঙ্গ এবং এছাড়াও তখনো পর্যন্ত দলের অন্যান্য প্রবীণ নেতা-কর্মীর খবর অজানা থাকায় সমাবেত দলীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে দিল্লির উক্ত সভায় তাজউদ্দীন আহমদ নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রূপে তুলে ধরেন।

সেই বৈঠকে তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীর নিকট স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বাধীনতার স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন।

ভারতীয় প্রথানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

এভাবেই তাজউদ্দীন আহমদের হাত ধরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ধারণার সূচনা হয়।

৪ঠা এপ্রিল দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাজউদ্দীনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা সম্পন্ন হয়।

১০ই এপ্রিল মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সনদ ঘোষণা করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১১ই এপ্রিল তাজউদ্দীন বেতারে ভাষণ দেন।

১৭ই এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। সেই অস্থায়ী সরকারে তাজউদ্দীন আহমদ হন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।

১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের আগ পর্যন্ত অস্থায়ী সরকার কলকাতা থেকে বাংলাদেশের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত দৃঢ়তা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এতে নেতৃত্ব দেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়:

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু যখন জেল থেকে মুক্তি পান, তখন তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী পদ হতে সরে দাঁড়ান। এবং বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বগ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্বরত ছিলেন।

১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিলের সমাপনী অধিবেশন অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা প্রদানের মাধ্যমে তিনি দল, সরকার এবং নেতা-কর্মীদের মাঝে দূরত্ব দূর করেন। এর পাশাপাশি সংগঠন এবং সরকারের মাঝে এক নিবিড় সম্পর্ক গঠন করতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান৷

আরো পড়ুন:
মহান নেতার মহান কথা – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান 
মহাত্মা গান্ধী – ভারতীয় রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
স্তানিস্লাভ পেত্রভ – দ্য ম্যান হু সেভড দ্য ওয়ার্ল্ড

পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের বিরোধ হয়, যার ফলে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবের সাথে তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের বিশ্বস্ত এই রাজনৈতিক পথচলা সহকর্মীর ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।

অতঃপর, ১৯৭৪ এর ২৬ অক্টোবর তাজউদ্দীন আহমদ মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট প্রথম গৃহবন্দী এবং তারপরে ২৩শে আগস্ট গ্রেফতার করা হয় তাঁকে।

সংস্কৃতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ:

তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় প্রচুর প্রামাণ্য চিত্র, তথ্যচিত্র, উপন্যাস ইত্যাদি রচিত হয়েছে।

  • ২০০৭ সালে তানভীর মোকাম্মেল তাঁকে নিয়ে “তাজউদ্দীনঃ বিস্মৃত বীর” নামক একটি প্রামাণ্য তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। যেটি একই বছরের ২৫শে মার্চ মুক্তি পায়।

  • ২০১৬ সালে নবীন লেখক সুহান রিজওয়ান “সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ” শিরোনামে একটি রাজনৈতিক উপন্যাসে তাজউদ্দীন আহমদের চরিত্রকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন পূর্বক উক্ত চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়কে নিজস্ব আঙ্গিকে চিত্রায়িত করেন।

  • ২০২০ সালের আগস্ট ১৯৭৫ নামক চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় অভিনেতা তৌকির আহমেদ তাজউদ্দীন এর চরিত্রটি চিত্রায়িত করেন।

  • বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার সদর থানায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ এবং বঙ্গতাজ অডিটোরিয়াম মিলনায়তন উভয়ই তার নামে নামাংকিত করা হয়েছে।

মৃত্যু:

আমরা সবাই জানি যে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হন। একইসঙ্গে সেসময় আরও ৪ জন জাতীয় নেতাকে বন্দী করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

প্রথমে তাঁকে বন্দী করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর সেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থাতেই ঘাতকের বুলেটে নিহত হন তৎকালীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।

এদিন তাজউদ্দীন ছাড়াও তৎকালীন বাংলাদেশের আরও ৩ জন বিশিষ্ট নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তাই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘জেল হত্যা দিবস’ নামে পরিচিত।

তাঁকে হারিয়ে বাংলাদেশ এক বিশাল ক্ষতির স্বীকার হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই মানুষটির অবদান অনস্বীকার্য। দেশের স্বার্থে সবসময় আপোষহীন ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

তাই বাঙালীর হৃদয়ে তাজউদ্দীন আহমদের নাম চির অম্লান হয়ে থাকবে।

subscribe to our youtube channel 2

শেয়ার করুন -

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন